বুধবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ০১:২৭ অপরাহ্ন

বাংলাদেশ পোশাক রফতানিতে কম দাম পাচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর থেকে

প্রতিনিধির / ৩০ বার
আপডেট : শুক্রবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২২
বাংলাদেশ পোশাক রফতানিতে কম দাম পাচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর থেকে
বাংলাদেশ পোশাক রফতানিতে কম দাম পাচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর থেকে

গত আগস্টে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদন ‘দি গার্মেন্টস কস্টিং গাইড ফর স্মল ফার্মস ইন ভেল্যু চেইন’ এ আইটিসি বিভিন্ন পোশাক রফতানিকারক দেশগুলোর ‘ফ্রি অন বোর্ড’ বা এফওবি প্রাইসের তুলনা করে এ বৈষম্য উদঘাটন করে।

এমনকি অনেক ক্ষেত্রেই রফতানিকারকরা তাদের উৎপাদন খরচের থেকেও কমমূল্যে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। ফলে অনেক কারখানাই প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ব্যবসা থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হচ্ছে।

চীনের পরই বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশ। গত বছর বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে ৪ হাজার ২০০ কোটি ডলারের বেশি তৈরি পোশাক রফতানি করেছে।

আইটিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো তাদের রফতানি করা পোশাকের দাম বিশ্বের গড়মূল্যের থেকে অনেক কম পাচ্ছে। অথচ একই পণ্য ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক ও মেক্সিকোর মতো দেশগুলোর থেকে ক্রেতারা বেশি দামে কিনছেন। যা বিশ্বের গড়মূল্য ও বাংলাদেশের থেকে অনেক বেশি।

আইটিসি তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে নমুনা হিসেবে ২০২০ সালে বাংলাদেশের ১০টি তৈরি পোশাক পণ্যের রফতানি মূল্যকে উপস্থাপন করেছে। এক্ষেত্রে তারা যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের দেয়া তথ্যকে তুলে ধরে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২০ সালে প্রতি পিস ‘মেনস ওভেন কটন ট্রাউজার’ এর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রফতানি মূল্য পেয়েছে ৭ দশমিক ১ ডলার। যা বৈশ্বিক গড়মূল্য ৭ দশমিক ৭২ ডলারের থেকে ৯ দশমিক ২০ শতাংশ কম।

একই পণ্যের জন্য ভিয়েতনাম রফতানি মূল্য পেয়েছে ১০ দশমিক ৭৬ ডলার, যা বৈশ্বিক গড়মূল্যের থেকে ৩৪ দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি। একই পণ্যের ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশ ভারত পেয়েছে ৮ দশমিক ৪১ ডলার এবং শ্রীলঙ্কা পেয়েছে ৮ ডলার।

আবার ‘মেনস কটন জিন্স’ এর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রতি পিসে রফতানি মূল্য পেয়েছে ৭ দশমিক ৮১ ডলার, যা বৈশ্বিক গড়মূল্যের থেকে ৭ দশমিক ২০ শতাংশ কম। এ পণ্যের বৈশ্বিক গড়মূল্য ৮ দশমিক ৪১ ডলার। একই পণ্যে ভারত পেয়েছে ৯ দশমিক ১৩ ডলার এবং ভিয়েতনাম পেয়েছে ১১ দশমিক ৫৫ ডলার।

আবার ‘ওমেন্স কটন জিনসের’ বৈশ্বিক গড়মূল্য যেখানে ৮ দশমিক ৭৯ ডলার, সেখানে বাংলাদেশ পেয়েছে ৭ দশমিক ৫৬ ডলার। অর্থাৎ বৈশ্বিক গড়মূল্যের থেকে বাংলাদেশ ১৪ শতাংশ কম পেয়েছে। অপরদিকে একই পণ্য রফতানিতে ইন্দোনেশিয়া পেয়েছে ৯ দশমিক ১৪ ডলার, শ্রীলঙ্কা পেয়েছে ৮ দশমিক ৬৭ ডলার এবং তুরস্ক পেয়েছে ১৫ দশমিক ৮৪ ডলার।

জেনেভাভিত্তিক জাতিসংঘের শ্রমবিষয়ক অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সেন্টারের (আইটিসি) এক গবেষণায় সম্প্রতি এমন তথ্য উঠে এসেছে।

তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, একই গার্মেন্টস পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক গড়মূল্য থেকে কম দিচ্ছেন ক্রেতারা। অথচ একই সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী রফতানিকারক দেশগুলোকে ৩২ থেকে ৮৩ শতাংশ পর্যন্ত বেশি মূল্য দিচ্ছেন তারা।

অবশ্য অভিযোগটি নতুন নয়। অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশি পোশাক রফতানিকারকরা অভিযোগ করে আসছেন যে তারা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে তুলনামূলক কমমূল্য পেয়ে আসছেন।এবার আইটিসির এ গবেষণায় বিষয়টির সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হলো।

অবশ্য গবেষণায় বাংলাদেশের কম রফতানি মূল্য পাওয়ার কিছু কারণও চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের মোট রফতানির ৮০ ভাগই মাত্র ৫টি কটন পণ্যে সীমাবদ্ধ। এ পণ্যগুলোর উৎপাদকের সংখ্যা বেশি থাকায় অর্ডার পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতাও বেশি। ফলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে রফতানিকারকরা দাম কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। আর এ সুযোগটিই নিচ্ছেন আন্তর্জাতিক ক্রেতারা।

এক্ষেত্রে পোশাক রফতানিকারকদের প্রতি পণ্যের বৈচিত্রকরণের ওপর জোর দেয়ার কথা জানিয়েছে আইটিসি। হংকং, সিংগাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার রফতানিকারকরা যেখানে তাদের পণ্যের বৈচিত্রকরণের পাশাপাশি পণ্য উৎপাদনে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশসহ অন্যান্য স্বল্পন্নোত কিংবা উন্নয়নশীল দেশগুলো সেই পুরোনো সেলাইভিত্তিক উৎপাদন পদ্ধতিতেই পড়ে আছে। এ কারণে এসব দেশের উৎপাদকরা তাদের পণ্যের যথাযথ মূল্য পাচ্ছে না।

আইটিসির গবেষণায় দেখানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পণ্যের বেশি মূল্য দিতে রাজি হলেও পণ্যের বৈচিত্রকরণের অভাবে বাংলাদেশসহ অন্যান্য স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর উৎপাদকরা এ সুযোগ নিতে পারছে না। পক্ষান্তরে আধুনিক প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে পণ্যের যথাযথ উৎপাদন খরচ নির্ধারণের মাধ্যমে এক্ষেত্রে এগিয়ে গেছে তুরস্ক, মেক্সিকো, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো।

এ বিষয়ে পোশাক রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম সময় সংবাদকে বলেন, ‘আইসিটির রিপোর্টে উঠে এসেছে বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের থেকে অনেক কম দামে পোশাক রফতানি করতে বাধ্য হচ্ছে। আমরা বিজিএমইএর পক্ষ থেকে আমাদের সব সদস্যসহ বাংলাদেশের পোশাক উৎপাদক ও রফতানিকারকদের বলবো, বাজারে প্রাইসিং যেমন, তাদের সেভাবেই রফতানি পণ্যের প্রাইসিং করা উচিত। তাতে কোনো ফ্যাক্টরি বিপদে পড়বে না, শ্রমিকের বেতন ভাতাও দেরি হবে না। কস্টিং যদি কম হয়ে যায়, এটা সবার জন্যই একটা ব্যাড সিগনাল। এতে কারখানাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই সবারই দায়িত্ব মার্কেটে যখন যেমন প্রাইস, সেটা মাথায় নিয়েই তারা যেন পণ্যের কস্টিং করেন।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ