বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:০৭ অপরাহ্ন

বাংলাদেশ বিমানের সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে টিকিট বিক্রিতে কারসাজির অভিযোগ

প্রতিনিধির / ২৬ বার
আপডেট : শুক্রবার, ২১ অক্টোবর, ২০২২
বাংলাদেশ বিমানের সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে টিকিট বিক্রিতে কারসাজির অভিযোগ
বাংলাদেশ বিমানের সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে টিকিট বিক্রিতে কারসাজির অভিযোগ

বাণিজ্য, শিক্ষা ও পর্যটন খাতে বাংলাদেশ ও চীনের নাগরিকদের মধ্যে আকাশপথে ভ্রমণ ক্রমেই বাড়ছে।যাত্রীদের বিপুল চাহিদার বিপরীতে ফ্লাইট কম হওয়ায় এই রুটে টিকিটের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। অভিযোগ উঠেছে, এই সুযোগে ফায়দা লুটেছেন বিমানের ওই সাত কর্মকর্তা।

বাংলাদেশ বিমানের সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে টিকিট বিক্রিতে কারসাজির অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা থেকে চীনের গুয়াংজুগামী ফ্লাইটের টিকিট বিক্রিতে তাঁরা পছন্দের একটি ট্রাভেল এজেন্সির যোগসাজশে আর্থিক ফায়দা নিয়েছেন বলে অভিযোগ এসেছে। এ ব্যাপারে অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা হলেন বিমানের বিপণন ও বিক্রয় অধিদপ্তরের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন, ব্যবস্থাপক (ই-কমার্স) আবু জাফর মোহাম্মদ শামসুল আলম, ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থাপক (রাজস্ব) এ কে এম শহিদুল হাসান, মহাব্যবস্থাপক (বিক্রয়) দিলীপ কুমার, মহাব্যবস্থাপক (রাজস্ব) মোহাম্মদ মিজানুর রশীদ, উপমহাব্যবস্থাপক (মূল্য নির্ধারণ ও আরএমএস) মোহাম্মদ আলী ওসমান নূর ও ব্যবস্থাপক কমার্শিয়াল আনায়েত হোসেন। এই কর্মকর্তারা ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর কাছে টিকিট বিক্রি প্রাথমিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন।

কর্মকর্তাদের মধ্যে আদান-প্রদান করা ই-মেইলগুলোতে মহাব্যবস্থাপক (বিপণন ও বিক্রয়) সালাহউদ্দিন অন্যদের টিকিট বিক্রির বিষয়ে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করতে বলেন।টেকঅফ ট্রাভেলসে টিকিট বিক্রির অনুমোদন ওই কর্মকর্তাদের ই-মেইলের মাধ্যমে করা হয়েছিল। টেকঅফ ট্রাভেলসের ব্যবস্থাপক আতাহারুল ইসলাম ১৪ আগস্ট ২০ জন যাত্রীর জন্য বিশেষ ভাড়া সুবিধা দেওয়ার আবেদন করেন। তাঁর আবেদন আমলে নিয়ে জি এম সালাহউদ্দিন প্রতি টিকিটে ২০ হাজার থেকে এক লাখ ৭৬ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত কমানোর অনুমোদন দেন।

বিমানের এমডি দাবি করেছেন, কোনো ট্রাভেল এজেন্সিকে প্রথম ফ্লাইটের টিকিট বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়নি। নিয়ম লঙ্ঘন করে টেকঅফ ট্রাভেলসের টিকিট বিক্রির বিষয়টি তিনি অবগত নন।এখন বিমান বাংলাদেশের ঢাকা-গুয়াংজু ইকোনমি ক্লাসের একমুখী (ওয়ান ওয়ে) ভাড়া দুই হাজার মার্কিন ডলারের বেশি নেওয়া হচ্ছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় দুই লাখ ১০ হাজার টাকা।ঢাকা থেকে গুয়াংজু রুটে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস ও চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইনস।

এর মধ্যে গত ১৮ আগস্ট ঢাকা থেকে চীনের গুয়াংজু রুটে বিমান বাংলাদেশের ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়। তবে প্রথম ফ্লাইটেই নিজেদের ‘পছন্দের’ ট্রাভেল এজেন্সিকে টিকিট বিক্রিতে সহায়তা করার মাধ্যমে নিয়ম লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থাটি।বেসরকারি সংস্থা ‘টেকঅফ ট্রাভেলস’ থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার জন্য বিমানের কর্মকর্তাদের বহিষ্কার ও গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন ট্রাভেল এজেন্ট ও রিক্রুটিং এজেন্সির নেতারা।

বিমানের টিকিট বুকিং এবং ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইএটিএ) নীতিমালা অনুযায়ী, বিমান কোনো একক এজেন্টকে তার টিকিট বিক্রি করার অনুমতি দিতে পারে না। প্রথম ফ্লাইটের ক্ষেত্রে এটি একদমই নিষিদ্ধ। এ ছাড়া কোনো এজেন্সিকে একতরফা ও অনানুষ্ঠানিকভাবে টিকিট বিক্রির অনুমতি দেওয়া রীতিমতো কালোবাজারে টিকিট বিক্রির সমতুল্য।

বিমানের বিপণন ও বিক্রয় অধিদপ্তরের (এমএসডি) বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য, প্রতি টিকিটের জন্য ৭ শতাংশ কমিশনের ভাগের শর্তে বিভাগের কিছু শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে মৌখিক চুক্তির মাধ্যমে টেকঅফ ট্রাভেলস অবৈধভাবে কাজটি পেয়েছে। এর অর্ধেক টাকা গেছে বিমানের সিন্ডিকেটের কর্মকর্তাদের পকেটে।

সূত্র জানায়, ৩০০ আসনের বোয়িং-৭৭৭-এর প্রথম ফ্লাইটটি ১৭৭ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকা ছেড়েছিল। তবে ওই ফ্লাইটে ‘টেকঅফ ট্রাভেলস’ এজেন্সির মাধ্যমে ১৭৭টি টিকিট বিক্রি হয়েছিল। যদিও ফ্লাইট সম্পর্কে বলা হয়েছিল, এই ফ্লাইটের টিকিট কেবল বিমান বাংলাদেশের অফিশিয়াল কাউন্টারে পাওয়া যাবে।

সূত্র জানায়, ফ্লাইটটির টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার নির্ধারিত দিনের আগেই টেকঅফ ট্রাভেলসের কাছে প্রায় ৫০টি টিকিট বিক্রি করা হয়। ওই ফ্লাইটের বেশির ভাগ যাত্রীই ছিলেন চীনা নাগরিক।

বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আনার পর ১৫ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় ঢাকা-গুয়াংজু ফ্লাইটটি ঢাকা থেকে যাত্রা করে। বিমানের কাউন্টার থেকে ফ্লাইটের সব টিকিট বিক্রি করা হয়। পরে ১২ সেপ্টেম্বর আবার বিমান বাংলাদেশ নির্দেশনা দেয়, কেবল অফিশিয়াল কাউন্টার এবং কেন্দ্র থেকে টিকিট বিক্রি করার।

তবে ঢাকা-গুয়াংজুর তৃতীয় ফ্লাইটের ৬০টি টিকিট বিক্রির জন্য বিমান এরই মধ্যে একজন জিএসএ এজেন্ট ব্যবহার করেছে। এটি ১৩ অক্টোবর যাত্রা শুরু করেছে। পরবর্তী ফ্লাইট ১০ থেকে ১১ নভেম্বর যাত্রা শুরু করতে পারে।

বিমান কার্যালয়ে দুদক : ঢাকা-গুয়াংজু ফ্লাইটের টিকিটে অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানে বিমানের প্রধান কার্যালয়ে গত ১২ অক্টোবর বেশ কিছু নথি সংগ্রহ করেছেন দুদকের কর্মকর্তারা।

দুদকের সহকারী পরিচালক আফনান জান্নাত কেয়ার নেতৃত্বে একটি দল বিমানের সংশ্লিষ্ট বিভাগ পরিদর্শন করেছে। এদিন সকাল ১১টা থেকে রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত বিমান কার্যালয়ে অবস্থানকালে বিমানের এমডি ও সিইও জাহিদ হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন দুদক কর্মকর্তারা।দুদকের মিডিয়া উইং জানায়, ঢাকা-গুয়াংজু রুটের টিকিটের অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বিমান অফিসে গিয়ে প্রাসঙ্গিক নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে বিমানের এমডি ও সিইও জাহিদ হোসেন  বলেন, ‘আমার জানা মতে গুয়াংজু রুটের টিকিট বিমানের নিজস্ব সেলস সেন্টার থেকে বিক্রি হয়েছে। আমাদের টিকিট বিক্রির নীতিমালা অনুযায়ী বিক্রি হয়েছে। এখানে অনিয়মের কিছু নেই। টেকঅফ ট্রাভেলস কী করেছে, সেটা আমার জানা নেই। ’

আটাবের চিঠি : বিমানের ঢাকা-গুয়াংজু ফ্লাইটে টিকিট বিক্রিতে দুর্নীতি রোধে এবং সব এজেন্সির মাধ্যমে টিকিট বিক্রির নির্দেশনা চেয়ে বিমানের এমডিকে চিঠি দিয়েছে অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব)।

সংগঠনটির মহাসচিব আবদুস সালাম আরেফ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়েছে, বিমান বাংলাদেশ ১০ আগস্ট ই-মেইল সার্কুলারের মাধ্যমে এজেন্সিগুলোকে ঢাকা-গুয়াংজু-ঢাকা ফ্লাইট অবহিত করে। কিন্তু এজেন্সিগুলো দেখতে পায়, তাদের জন্য কোনো টিকিট নেই। একটি বিশেষ এজেন্সিকে সব টিকিটের বুকিং/ইস্যু অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যদিও বিমান সরাসরি যাত্রীর কাছে টিকিট বিক্রি করবে বলে প্রজ্ঞাপন দিয়েছিল।

আটাবের চিঠিতে বলা হয়, যাত্রীরা টিকিট না পেয়ে এজেন্টকে দোষারোপ করেছেন। অন্যদিকে এজেন্সিগুলোর আর্থিক ক্ষতিসহ সুনাম নষ্ট হচ্ছে। বিমান জাতীয় ক্যারিয়ার হিসেবে একই নীতি অবলম্বন করবে সেটাই কাম্য।

বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ঘোলাটে পরিস্থিতি তৈরি করা হলে বিমানের সুনাম যেমন নষ্ট হবে, তেমনি সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হবে। বারবার বিমানের গুয়াংজু রুটের টিকিট বিক্রির সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করার পেছনে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল রয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে আটাব।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ