শনিবার, ১০ ডিসেম্বর ২০২২, ০৩:১৯ অপরাহ্ন

উদ্যোগ না থাকায় জ্ঞান ও দক্ষতা ছাড়াই তৈরি হচ্ছে চিকিৎসক

প্রতিনিধির / ৩০ বার
আপডেট : শনিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২২
উদ্যোগ না থাকায় জ্ঞান ও দক্ষতা ছাড়াই তৈরি হচ্ছে চিকিৎসক
উদ্যোগ না থাকায় জ্ঞান ও দক্ষতা ছাড়াই তৈরি হচ্ছে চিকিৎসক

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি ১০ শিক্ষার্থীর জন্য একজন প্রভাষক এবং ২৫ শিক্ষার্থীর জন্য একজন বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক (সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, অধ্যাপক) থাকতে হবে। প্রতি বছর ১০০ শিক্ষার্থী ভর্তি করে এবং পাঁচটি শিক্ষাবর্ষ চালু আছে- এমন মেডিকেল কলেজে থাকতে হবে ১৫৪ শিক্ষক।

সেই হিসাবে দেশের ৩৬টি সরকারি মেডিকেলে আটটি বুনিয়াদি বিষয়ে পড়ানোর জন্য অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপক মিলে ১ হাজার ৯৯৭টি পদ আছে। তবে পাঠদান চলছে ১ হাজার ২৭৪ শিক্ষক দিয়ে। সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে বুনিয়াদি আটটি বিষয়ে ৩৬ শতাংশ শিক্ষকের পদই শূন্য।

এই সংকট বহু বছর ধরেই চলে আসছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ৩৬টি মেডিকেল কলেজে অধ্যাপক রয়েছেন মাত্র ৭২ জন। সহযোগী অধ্যাপক ১৫৭ জন। সহকারী অধ্যাপক ১৯৬ জন এবং প্রভাষক রয়েছেন ৮১১ জন।দেশের সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে শিক্ষকের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারি মেডিকেল কলেজে বুনিয়াদি বিষয়ে পাঠদান চলছে ৬৪ শতাংশ শিক্ষক দিয়ে।

 

বেসরকারি কলেজের অবস্থা আরও নাজুক। পরিস্থিতি পরিবর্তনে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ না থাকায় জ্ঞান ও দক্ষতা ছাড়াই তৈরি হচ্ছে চিকিৎসক। এতে ভুল চিকিৎসায় প্রতিনিয়ত রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠছে; আবার ভোগান্তির শিকারও হচ্ছেন রোগীরা। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, চাইলেই নতুন শিক্ষক তৈরি করা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে কাজ করছে সরকার। পরিস্থিতি উত্তরণে আরও কয়েক বছর লাগবে।

 

এদিকে, দফায় দফায় নির্দেশনা দেওয়ার পর ৭২টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষকের তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এখনও ১৪টি মেডিকেল কলেজে কারা পড়াচ্ছেন, জানে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ৫৮টি মেডিকেল কলেজে শিক্ষকের সংখ্যা ৪ হাজার ৬২৫ জন। তাঁদের মধ্যে ৮৯০ জন অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ৮৯৫ জন, প্রভাষক রয়েছেন ১ হাজার ৯৬৮ জন। তবে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনুযায়ী এসব মেডিকেল কলেজে প্রায় ৯ হাজার শিক্ষক প্রয়োজন।
সংশ্নিষ্টরা বলছেন, মেডিকেল শিক্ষকরা রোগী দেখার সময় কম পাচ্ছেন। এ ছাড়া অন্যান্য দেশের তুলনায় সুযোগ-সুবিধা কম থাকায় চিকিৎসকরা এসব বিষয়ে পাঠদানে উৎসাহিত হচ্ছেন না। প্রণোদনা ঘোষণাসহ বেশ কিছু উদ্যোগ নিলেও তেমন সাড়া মেলেনি। শিক্ষক সংকট দূর না করে দফায় দফায় মেডিকেল কলেজ অনুমোদন দেওয়াকে এমন পরিস্থিতির জন্য দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাঁরা বলছেন, এ নিয়ে একাধিকবার তাগাদা দিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে তিনটি নতুন মেডিকেল কলেজ শিক্ষার্থী ভর্তির অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে দুটি চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব কলেজের শিক্ষকের কোনো পরিসংখ্যান নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ কে এম আমিরুল মোরশেদ সমকালকে বলেন, শিক্ষক সংকট নিরসনে এর মধ্যে বেসিক সায়েন্সে ৪২২ শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষক তৈরি না হওয়া এবং বিভাগ অনুযায়ী পদোন্নতি আটকে থাকায় এই সংকট। দীর্ঘদিন পর ফের বিভাগীয় পর্যায়ে শিক্ষকদের পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। আশা করি দ্রুত সময়ে সংকট কেটে যাবে।

চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব বলেন, নৈতিকতার আলোকে প্রতিটি মেডিকেল কলেজে শিক্ষক নিয়োগ নেওয়া উচিত। এ বিষয়ে অনেকবার বলা হয়েছে; সরকার উদ্যোগ নিচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। ৩৬টি সরকারি মেডিকেল কলেজের মধ্যে ১৭টিতেই হাসপাতাল নেই। কলেজগুলোতে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে প্র্যাকটিস করার সুযোগও কম পান। ক্লিনিক্যাল শিক্ষাও তেমন পাচ্ছেন না। এ কারণে জ্ঞান ও দক্ষতা ছাড়াই তৈরি হচ্ছে চিকিৎসক।
তিনি আরও বলেন, বিসিএসের মাধ্যমে মেডিকেল শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ায় জটিলতা থেকেই যাচ্ছে। যথাসময়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয় না। যার প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ওপর।

বাংলাদেশ বেসরকারি মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম এ মুবিন খান বলেন, এমন পরিস্থিতি তো আর রাতারাতি পরিবর্তন হবে না। শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন মেডিকেলের সঙ্গে বৈঠক করা হচ্ছে। একটা পরিবর্তন আনতে অবশ্যই শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সরকারি উদ্যোগ নেওয়া দরকার। সংকট নিরসনে ৫ থেকে ৭ বছর সময় লাগবে।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের একজন পরিচালক  বলেন, সারাদেশে পদের বিপরীতে অর্ধেকেরও কম শিক্ষক রয়েছেন। প্রতি বছরই বুনিয়াদি বিষয়ের ২৫ থেকে ৩০ জন করে জ্যেষ্ঠ শিক্ষক অবসরে চলে যাচ্ছেন। তবে এসব বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে চিকিৎসকরা আগ্রহী না হওয়ায় প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ