শনিবার, ১০ ডিসেম্বর ২০২২, ০৭:৫২ পূর্বাহ্ন

সংকট আরও তীব্র হতে পারে আশঙ্কা আইএমএফের

প্রতিনিধির / ৩৩ বার
আপডেট : সোমবার, ৭ নভেম্বর, ২০২২
সংকট আরও তীব্র হতে পারে আশঙ্কা আইএমএফের
সংকট আরও তীব্র হতে পারে আশঙ্কা আইএমএফের

প্রায় টানা দুই বছরের করোনা মহামারি কাটিয়ে গত বছর নভেম্বরেও দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বেশ স্থিতিশীল ছিল। বিশেষ করে আমদানি পর্যায়ে ছিল মোটামুটি স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি। অভ্যন্তরীণ উৎপাদনও হয়েছিল বাম্পার। মহামারি করোনায় যখন সারা পৃথিবী ছিল অচল, তখনো দেশের বাজারে দ্র্রব্যমূল্য ছিল সহনীয়ই। অথচ কয়েক মাস ধরে দ্রব্যমূল্য, রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি, রপ্তানি-আমদানি, এডিপি বাস্তবায়ন, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, ব্যালান্স অব পেমেন্ট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ- সব ক্ষেত্রে সৃষ্টি হয়েছে মারাত্মক অস্বস্তি। প্রায় সবগুলো সূচকেই বিরাজ করছে অস্থিরতা, যা মূলত সামষ্টিক অর্থনীতির মধ্যে চাপ সৃষ্টি করছে। আর এ চাপ দিনকে দিন বাড়ছেই। বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংক বলছে, সামনের বছর দুর্ভিক্ষ আঘাত হানলে বৈশ্বিকভাবে এ চাপ আরও বাড়বে।

রিজার্ভ কমছে দ্রুতগতিতে। বাড়ছে না রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়। সুখবর নেই কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে। করোনার সময়ের চেয়েও এ মুুহূর্তের সংকট অনেক বেশি প্রকট। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে দেশের সমগ্র আর্থিক খাতের ঝুঁকি বেড়েছে। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হলে সংকট আরও তীব্র হতে পারে আশঙ্কা আইএমএফের

অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল জরুরি বৈঠক করেছেন কয়েকজন মন্ত্রী সচিবকে নিয়ে। বৈঠকে মুখ্য, অর্থ, বাণিজ্য, শিল্প সচিবসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে দেশের অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে সংকট মোকাবিলার জন্য নির্দেশনাও দেন। বিশেষ করে খাদ্য সংকট যাতে না হয় এ জন্য খাদ্য আমদানি, সার আমদানি ও খাদ্য উৎপাদন যেন ব্যাহত না হয় সে ব্যবস্থা নিতে বলেন। একই সঙ্গে খাদ্য মনিটরিং বাড়াতেও নির্দেশনা দেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২১ সালের ২ নভেম্বর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৪৬ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। আর ২ নভেম্বর ২০২২-এ বৈদেশিক মুদ্রা কমে নেমেছে ৩৫ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলারে। এর ফলে রিজার্ভ কমছে দ্রুতগতিতে। এক বছরে রিজার্ভ কমেছে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার। অবশ্য রিজার্ভের এ অঙ্ক প্রকৃতপক্ষে আরও অনেক কম বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বাড়ছে না রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়। সুখবর নেই কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে। করোনার সময়ের চেয়েও এ মুুহূর্তের সংকট অনেক বেশি প্রকট। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে দেশের সমগ্র আর্থিক খাতের ঝুঁকি বেড়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হলে সংকট আরও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, ঢাকা সফররত আইএমএফের ১০ সদস্যের প্রতিনিধদল সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংস্থার সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকে এ আশঙ্কার কথা জানিয়েছে।

অব্যাহত ডলার সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণে রিজার্ভ ভেঙে বাজারে ডলার ছাড়া হচ্ছে। তবু দাম কমছে না। সংকটও কাটছে না। ফলে ব্যাংকগুলো সময়মতো এলসি খুলতে পারছে না। এতে ব্যাহত হচ্ছে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম। ডলার সংকটের সবচেয়ে বেশি প্রভাব এখন জ্বালানি খাতে। জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে সব ধরনের জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে। এতে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে হু হু করে। আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে নাস্তানাবুদ হচ্ছে সাধারণ মানুষ। বিবিএসের হিসাবে, আগস্ট মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে তা কিছুটা কমে ৯ দশমিক ১০ শতাংশ হয়েছে। আগস্ট মাসে ১১ বছর তিন মাসের (১৩৫ মাস) মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি হয়েছে। এর আগে ২০১১ সালের মে মাসে সর্বোচ্চ ১০ দশমিক ২০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছে। ২০১১ সালের মে মাসের পর মূল্যস্ফীতি আর কখনোই ৯ শতাংশের বেশি হয়নি। বেসরকারি গবেষণা সংস্থগুলো বলছে, মূল্যস্ফীতির প্রকৃত চাপ আরও বেশি।

এ ছাড়া রপ্তানি খাতে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব টের পাওয়া গিয়েছিল সেপ্টেম্বরেই। ওই মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ রপ্তানি কমেছিল। অক্টোবরে এসে নেতিবাচক প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়েছে। গত বছর একই সময়ের তুলনায় এ মাসে রপ্তানি আয় কমেছে ৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ। গতকাল প্রকাশিত রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর অক্টোবরে ৪৩৫ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা গত অর্থবছর অক্টোবরের তুলনায় ৩৭ কোটি মার্কিন ডলার কম। ওই সময় রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ৪৭২ কোটি মার্কিন ডলার।

এদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়েই অর্থনীতির পরিস্থিতি টালমাটাল হয়ে পড়েছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে বৈশ্বিক অর্থনীতি সংকুচিত হওয়ার খবর দিয়েছে। বিশেষ করে আসন্ন বৈশ্বিক মন্দা ও দুর্ভিক্ষে উন্নয়নশীল দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এতে আগামীতে অনেক দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) কমে যাবে। পাশাপাশি মন্দার ঝুঁকি বাড়বে।

এ ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রধান দুই দল ইতোমধ্যে নানা ধরনের কর্মসূচি দিয়ে চলেছে। এ নির্বাচন এমন একটা সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন বিশ্বজুড়ে দুর্ভিক্ষ চরমভাবে আঘাত হানার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ঝুঁকি আরও বাড়ার আশঙ্কা করছে আইএমএফ। তবে অর্থনীতি কিংবা মানুষের জীবন-জীবিকা যে নিচের দিকে নামছে, সামনে বিপদের ঝুঁকি বাড়ছে- এতে কোনো সন্দেহ নেই বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যান, পর্যবেক্ষণ এবং আশঙ্কাও এমনটিই ধারণা করছে।

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘দেখুন, দ্রব্যমূল্য বেড়েছে এতে মূল্যস্ফীতি বাড়বে এটার জন্য জরিপের প্রয়োজন হয় না। তবে কী মাত্রায় বেড়েছে, সেটা সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে কি না, এর জন্য জরিপের প্রয়োজন হয়। সে কাজটাই করে বিবিএস। এখানে বিবিএসের অনেক কাজও এখন বিতর্ক এড়াতে পারে না। কারণ এ সংস্থাটির করা জরিপের রিপোর্ট সময়মতো প্রকাশ করা হয় না। প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে মানুষকে সঠিক তথ্য আমরা কতটা দিতে পারছি তা নিয়ে প্রশ্ন করাই যায়।’

চলমান এ সংকটের প্রভাব পড়েছে সরকারের বাজেট বাস্তবায়নেও। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা। এ সময়ে এনবিআর আদায় করেছে ৬৫ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা। ওই তিন মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৭১ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতেও পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে ৯ শতাংশের কম। সামনের দিনগুলোতে এ গতি আরও কমবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ