সোমবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৩, ০৪:০৩ পূর্বাহ্ন

সংযোগ সড়কেও অস্বাভাবিক ব্যয়

প্রতিনিধির / ২৪ বার
আপডেট : রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২২
সংযোগ সড়কেও অস্বাভাবিক ব্যয়
সংযোগ সড়কেও অস্বাভাবিক ব্যয়

মাতারবাড়ী কয়লানির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প দেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্পগুলোর একটি। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের সহজগম্যতায় জাতীয় মহাসড়ক এন-১ এর সঙ্গে যোগাযোগ নিশ্চিতের জন্য ৭ দশমিক ৭৫ কিলোমিটারের একটি সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালে। কিন্তু নির্ধারিত পাঁচ বছরের মেয়াদে সড়কটির নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। অন্যান্য অনেক প্রকল্পের মতো এটিরও বারবার মেয়াদ বাড়িয়ে প্রকল্প ব্যয় ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। কিন্তু এ সংযোগ সড়কের রাস্তা নির্মাণ, সেতুর নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রকল্পে সড়ক ও জনপথ অংশের কাজে বিভিন্ন খাত ও অস্বাভাবিক ব্যয় বাড়িয়ে দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উত্থাপনের সুপারিশ করেছে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি)। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।এ প্রকল্পের আওতায় ৮৯৫ মিটারের কোহেলিয়া ব্রিজ নামের একটি খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২১৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতি মিটারে খরচ পড়ছে ২৪ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। এটি শুধু সেতু নির্মাণের জন্যই। এখানে জমি অধিগ্রহণের খাতটি আলাদা। তুলনামূলক অন্য সেতুর তুলনায় এটির নির্মাণ ব্যয় অস্বাভাবিক। যেমন, জমি অধিগ্রহণসহ নরসিংদীতে মেঘনার ওপর ৬৩০ মিটারের একটি সেতু নির্মাণে খরচ হয়েছিল ৯৮ কোটি টাকা। ৫১০ মিটারের আরেকটি সেতুতে খরচ হয়েছিল ১২৭ কোটি টাকা।

প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)। এতে ঋণ দিচ্ছে জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকা।সংযোগ সড়কটির অস্বাভাবিক ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি)। প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনীতে প্রথম সংশোধনীর তুলনায় ব্যয় কেন এত বেশি, তার ব্যাখ্যা চেয়েছে পিইসি। পুনর্গঠিত প্রস্তাবে কোহেলিয়া সেতুর ব্যয় বাড়ানোর কারণ হিসেবে যে ৫টি খাত বাড়ানোর যুক্তি দেখানো হয়েছে, তারও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

এ প্রকল্পের অন্য খাতগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ৫ দশমিক ২৩ কিলোমিটারের একটি সড়ক পুনর্নির্মাণ করতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪০ কোটি ৪২ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে খরচ ধরা হয়েছে ৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এছাড়া এ প্রকল্পের আওতায় প্রায় তিন কিলোমিটারের একটি সড়ক নতুন করে নির্মাণ করা হবে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪০ কোটি ৫৩ লাখ টাকারও বেশি। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটার রাস্তা নতুন করে নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ কোটি ৩১ লাখ টাকারও বেশি।পিইসি বলছে, সড়ক নির্মাণের ব্যয় বাড়ানোর যৌক্তিক ব্যাখ্যা পুনর্গঠিত প্রস্তাবে নেই। তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকারও অনুমোদন লাগবে।

শুধু তাই নয় ৫৪ মিটারের আরসিসি ব্রিজ নির্মাণে খরচ ধরা হয়েছে ৩১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ ৫৪ মিটারের আরসিসি ব্রিজ নির্মাণে প্রতি মিটারে খরচ পড়ছে ৫৮ লাখ টাকারও বেশি। একদিকে কয়েকটি ব্রিজ নির্মাণে আলাদা আলাদা খরচ ধরা হয়েছে, অন্যদিকে আলাদাভাবে ব্রিজ নির্মাণের জন্য থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এ থোক বরাদ্দে ঠিক কত মিটারের ব্রিজ নির্মাণ করা হবে তা উল্লেখ করা হয়নি।এছাড়া প্রকল্পের আওতায় ২ দশমিক ১০ কিলোমিটারের রিজিড পেভমেন্ট নির্মাণে খরচ ধরা হয়েছে ২০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে খরচ পড়ছে ৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। তীর রক্ষার জন্য ১৬২ কোটি ৩৬ লাখ টাকার থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে কত কিলোমিটারের তীর রক্ষা করা হবে তাও স্পষ্ট করা হয়নি প্রকল্প প্রস্তাবে।

প্রকল্পটি পর্যালোচনায় দেখা যায়, এটি প্রথমে ৬০২ কোটি ৩২ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে পাঁচ বছরের জন্য অনুমোদন পায় ২০১৫ সালের জুনে। কিন্তু প্রকল্পটি শুরুর এক বছর না গড়াতেই ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর প্রায় ৫৮ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে প্রথম সংশোধন অনুমোদন দেয় একনেক। কিন্তু তাতেও সময়মতো কাজ শেষ করতে না পারায় ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতিরেকে সময় বাড়িয়ে দেওয়া ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। অর্থাৎ সময় বেড়ে দাঁড়ায় ৭ বছরে।প্রকল্পটি এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু ২০২২ সালের জুনেও প্রকল্পটির কাজ শেষ না হওয়ায় কিছু খাত ও ব্যয় বাড়িয়ে দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। এতে দেখা যায় মূল প্রকল্প প্রস্তাবের তুলনায় ৫৫ দশমিক ২৮ শতাংশ ব্যয় বাড়িয়ে ১ হাজার ২৪ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এতে ব্যয় বাড়ছে ৩৬৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা। সময়ও চাওয়া হয়েছে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। অর্থাৎ সময় বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৯ বছরে।

প্রকল্পটির প্রায় পুরো অর্থায়নই জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার। দ্বিতীয় সংশোধনীতে দেখা যায় এতে জাইকার ঋণের পরিমাণ ৭৯১ কোটি ২৭ লাখ টাকা। মূল প্রকল্প প্রস্তাবে তাদের ঋণের পরিমাণ ছিল ৫০৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা। কিন্তু দ্বিতীয় সংশোধনীতে এসে তাদের ব্যয় বেড়ে ৭৯১ কোটি ২৭ লাখ টাকা হয়েছে অর্থাৎ প্রকল্পটিতে জাইকার অর্থায়নের পরিমাণ বেড়েছে ৫৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অবশ্য অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ এ ঋণের সম্মতিপত্র দিয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ