মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৩, ০৪:০৪ অপরাহ্ন

আন্তর্জাতিক অবরোধে জার্মানির বদলে চীনা যন্ত্রপাতি রূপপুরে

প্রতিনিধির / ১৩ বার
আপডেট : রবিবার, ১ জানুয়ারী, ২০২৩
আন্তর্জাতিক অবরোধে জার্মানির বদলে চীনা যন্ত্রপাতি রূপপুরে
আন্তর্জাতিক অবরোধে জার্মানির বদলে চীনা যন্ত্রপাতি রূপপুরে

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উপকেন্দ্রের (জিআইএস সাবস্টেশন) যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও স্থাপন কাজ থেকে জার্মান ও সুইজারল্যান্ডের কোম্পানি সরে যাওয়ার পর সে কাজ চীনা কোম্পানিকে দেওয়া হয়েছে। রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর অবরোধের কারণে আর্থিক বিবেচনায় দেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্পে এ পরিবর্তন এসেছে। এর ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের এ উপকেন্দ্র নির্মাণে দেরি হবে। আর সব মিলিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার কাজ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়া আরেক দফায় পিছিয়ে পড়বে।

 

গত বৃহস্পতিবার পাবনায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সরেজমিন ঘুরে এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রূপপুর কেন্দ্রের দুইটি ইউনিটের প্রতিটির উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পরমাণু শক্তি কমিশনের তত্ত্বাবধানে রূপপুর প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের খরচ নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি। আর্থিক বিবেচনায় এটি দেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প। সিংহভাগ খরচ (৯০ হাজার কোটি টাকার বেশি) রাশিয়া সরকারের ঋণসহায়তা থেকে নির্বাহ করা হচ্ছে। এটির নির্মাণ ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়াত্ত সংস্থা রোসাটম এবং অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট। কেন্দ্রটির জীবনকাল ৬০ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এর প্রতিটি ইউনিটে প্রতি ১৮ মাসে একবার রিফুয়েলিং (পরমাণু জ্বালানি সরবরাহ) করা হবে।

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং রাশিয়ার অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্টের মধ্যে ২০১৫ সালে সম্পাদিত সাধারণ চুক্তি অনুযায়ী কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ২০২১ সালে শুরু হওয়ার কথা ছিল। দুই দফা পেছানোর পর গত অক্টোবরে হালনাগাদকৃত সর্বশেষ সূচি অনুযায়ী, এর প্রথম ইউনিটটির নির্মাণকাজ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২৪ সালের শেষ ভাগে। তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা এখন বলছেন, প্রথম ইউনিটটি ২০২৪ সালে উৎপাদনে আসবে।গত বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া এবং সরেজমিন ঘুরে দেখার পর তিনি জানান, করোনা মহামারির কারণে প্রকল্পের কাজ কিছুটা পিছিয়ে গেছে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের কাজও শুরু করতে দেরি হয়েছে। তবে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সার্বিকভাবে কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক। প্রথম ইউনিটের কাজ ৮৭ শতাংশ শেষ হয়েছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে এটি উৎপাদনে আসতে পারে। বিজ্ঞান মন্ত্রণালয় ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় এখন সমন্বয় করে কাজ এগিয়ে নিচ্ছে।

তিনি আরো জানান, ২০২৩ সালে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) স্বাক্ষরিত হতে পারে। ঐ চুক্তির খসড়া ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে। এই কেন্দ্রের প্রতি ইউনিট (কিলোওয়াট) বিদ্যুতের দাম এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে তা ৪-৫ টাকা হতে পারে। ৬০ বছর ধরে এই একই দামে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির রিঅ্যাকটর ব্যবহার করা হয়েছে। এটা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সর্বশেষ প্রযুক্তি। রূপপুর কেন্দ্রটি রাশিয়ান কোম্পানি নির্মাণ করলেও এর ৪০০ কেভি ও ২৩০ কেভির বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রটির কাজ পেয়েছিল জার্মানির সিমেন্স এবং সুইজারল্যান্ডের এবিবি। উপকেন্দ্র নির্মাণের প্রাথমিক কাজও শেষ হয়েছে। তবে প্রধান যন্ত্রপাতিগুলো ছিল আমদানির অপেক্ষায়। এমন অবস্থায় গত নভেম্বরে ঐ যন্ত্রপাতি আমদানি করতে অস্বীকৃতি জানায় এ দুইটি পশ্চিমা কোম্পানি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জের ধরে আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ান প্রকল্পের জন্য যন্ত্রপাতি আমদানিতে নিজ নিজ দেশের অনুমোদন পায়নি সিমেন্স ও এবিবি।রূপপুরের উপকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি সিমেন্স ও এবিবি আমদানি করতে অস্বীকৃতি জানানোর পর এখন চীনা কোম্পানি সি উয়ান ইলেকট্রিক কোম্পানি থেকে কিনবে রোসাটম। জার্মান ও সুইজারল্যান্ডের মানদণ্ড অনুযায়ী চীনা কোম্পানি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করতে পারবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে প্রকল্প পরিচালক ড. শৌকত আকবর জানান, মানের কোনো ব্যত্যয় হবে না। সঠিক মানদণ্ড রক্ষা করেই যন্ত্রপাতি আমদানি ও স্থাপন করা হবে।

সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুইটি ইউনিটের মধ্যে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিটের ৮৭ শতাংশ কাজ শেষ। প্রথম ইউনিটের দুটি কুলিং টাওয়ারের একটির নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ। প্রতিটি টাওয়ারের উচ্চতা হবে ১৭৫ ফুট। দ্বিতীয় ইউনিটের অপর দুটি কুলিং টাওয়ারের ৬০ শতাংশ নির্মাণ শেষ পর্যায়ে। প্রথম ইউনিটের টারবাইন ভবনের কাজ শেষ হয়েছে। কেন্দ্রটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রিঅ্যাকটর বসানোর ডোম ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। সেখানে রিঅ্যাকটর ভেসেল স্থাপন করা হয়ে গেছে। দুই নম্বর ইউনিটেরও রিঅ্যাকটর ভেসেল বসানোর প্রক্রিয়াও শেষ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ