মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৩, ১২:১৮ পূর্বাহ্ন

এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহে সংকট বাড়ছে

প্রতিনিধির / ২ বার
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ২৬ জানুয়ারী, ২০২৩
এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহে সংকট বাড়ছে
এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহে সংকট বাড়ছে

ডলার সংকটে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ীরা তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানিতে চাহিদা অনুযায়ী ঋণপত্র (এলসি) খুলতে পারছেন না। গ্যাস আমদানি ব্যাহত হওয়ায় বাজারে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহে সংকট বাড়ছে। এলপিজি সরবরাহকারী কম্পানিগুলো বলছে, ঢাকাসহ সারা দেশে তাদের এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ প্রায় অর্ধেক কমে গেছে।এই অবস্থায় খুচরা বিক্রেতারা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতি সিলিন্ডারে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা বাড়িয়ে বিক্রি করছেন। এলপিজি আমদানির সমস্যাটির দ্রুত সমাধান না হলে পণ্যটির তীব্র সংকটের আশঙ্কা করছেন এই খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এলপিজি আমদানিতে ঋণপত্র খোলা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বরাবর চিঠিও দিয়েছে এই খাতের কম্পানিগুলোর সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব)।

দেশে প্রায় এক যুগ ধরে আবাসিকে পাইপলাইন গ্যাস সংযোগ বন্ধ। এতে গ্রাহকের নির্ভরতা বাড়ছে পরিবেশবান্ধব এলপিজির ওপর। এলপিজি এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মতোই।লোয়াব সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে এলপিজি অনুমোদনপ্রাপ্ত সরবরাহকারী কম্পানি ৫৮টি। এর মধ্যে ২৪টি সক্রিয় আছে। এই খাতে বিনিয়োগ ৩২ হাজার কোটি টাকা। এলপিজির বার্ষিক চাহিদা ১৪ লাখ টনের বেশি, যার ৯৮ শতাংশই বেসরকারি উদ্যোক্তাদের দখলে। গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ পরিবার। তিন কোটি মানুষের বেশি এটির সুবিধাভোগী।

এলসির জটিলতায় বর্তমানে এলপিজি সরবরাহকারী ২৪টি কম্পানির মধ্যে ১২টি কম্পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। বাকি ১২টি কম্পানিকেও রেশনিং করে এলপিজি সরবরাহ করতে হচ্ছে। এতে বাজারে এখন এলপিজির সংকট দেখা দিয়েছে।

ওরিয়ন গ্যাস লিমিটেডের চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) প্রকৌশলী অনুপ কুমার সেন বলেন, ‘আমরা ব্যাংককে টাকা দিচ্ছি, কিন্তু ব্যাংকগুলো সরবরাহকারীদের সঠিক সময়ে ডলার দিতে পারছে না। এখন ডিউ পেমেন্টের ক্ষেত্রেও ব্যাংক গ্যারান্টেড হচ্ছে না। এতে সরবরাহকারীদের সঙ্গে এলপিজি আমদানিকারকদের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে।’তিনি বলেন, ‘নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এলসি দিতে না পারায় অনেক সময় আমাদের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা জরিমানা দিতে হচ্ছে। এমনও হয়েছে যে এলপিজিভর্তি জাহাজ আসার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে, তখন জানানো হলো আজ পেমেন্ট দেওয়া যাচ্ছে না। এতে দৈনিক জাহাজভাড়া হিসেবে ১২ হাজার ডলার জরিমানা দিতেও হয়েছে আমাদের। এসব কারণে খুব ক্ষতির মুখে আছি।’

অনুপ কুমার সেন বলেন, ‘এরই মধ্যে আমাদের এলপিজির সরবরাহ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে এলপিজি ব্যবসা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।’এনার্জি প্যাকের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান জি-গ্যাসের হেড অব বিজনেস আবু সাঈদ রাজা  বলেন, ‘একটি কার্গোতে দুই হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার মেট্রিক টন এলপিজি থাকে। এতে ২০ লাখ ডলারের প্রয়োজন হয়, যা একটি ব্যাংকের পক্ষে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। দুটি ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ ডলারের প্রয়োজন হওয়ায় ব্যাংকগুলো এলসি খুলতে চাচ্ছে না।’

আবু সাঈদ রাজা বলেন, ‘জ্বালানি হিসেবে এলপিজিকে অগ্রাধিকারে রাখা হলেও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডলার সরবরাহ দিচ্ছে না ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংককে এ বিষয়ে উদ্যোগী হতে হবে। এলসির জটিলতায় বর্তমানে এলপিজি সরবরাহকারী ২৪টি কম্পানির মধ্যে ১২টি কম্পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। বাকি ১২টি কম্পানিকেও রেশনিং করে এলপিজি সরবরাহ করতে হচ্ছে। এতে বাজারে এখন এলপিজির সংকট দেখা দিয়েছে।’জি-গ্যাসের হেড অব বিজনেস বলেন, ‘সরকারকে এখনই এ বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তা না হলে সামনে গ্রাহকরা বৈদ্যুতিক চুলায় রান্নায় ঝুঁকতে পারে, যা বিদ্যুতের চাহিদা বাড়িয়ে দেবে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারকে বেশি জ্বালানি ব্যবহার করতে হবে।’

গত রবিবার ও সোমবার সরেজমিনে ঢাকার মালিবাগ, পল্টন, বাড্ডা, গুলশান, ভাটারা, দক্ষিণ কুড়িলসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে এলপিজির সরবরাহ খুব কম। এতে খুচরা ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছেন। সরকার নির্ধারিত ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ২৩২ টাকা, সেটি এখন খুচরা ব্যবসায়ীরা বিক্রি করছেন এক হাজার ৪৫০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকায়।এলপিজির খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাঁরা চাহিদা অনুযায়ী কোনো কম্পানি থেকেই সিলিন্ডার পাচ্ছেন না। অনেক কম্পানি সরবরাহ একদম বন্ধ করে দিয়েছে। কিছু কম্পানি সরবরাহ দিলেও দাম বেশি দিয়ে কিনে আনতে হচ্ছে। এ কারণে তাঁরাও দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছেন।

নদ্দা এলাকার খুচরায় সিলিন্ডার বিক্রি প্রতিষ্ঠান মায়ের দোয়া এন্টারপ্রাইজে গিয়ে দেখা গেছে, দোকানের ভেতর ও বাইরে অর্ধশতাধিক খালি সিল্ডিলার জমে আছে।দোকানের মালিক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘কম্পানিগুলো সিলিন্ডার সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে, গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার দিতে পারছি না। দু-একটি কম্পানি বেশি দাম নিয়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার সরবরাহ দিচ্ছে, সেগুলো আমরা এক হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করছি।’

দেশের বাজারে এলপিজি সরবরাহকারী কম্পানিগুলোর মধ্যে মার্কেট শেয়ারে শীর্ষে আছে বসুন্ধরা এলপি গ্যাস। ঋণপত্র খুলতে জটিলতায় কম্পানিটির সরবরাহ প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। প্রতিষ্ঠানটির চিফ অপারেটিং অফিসার (ব্র্যান্ড অ্যান্ড মার্কেটিং) এম এম জসিম উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডলার সংকটে ব্যাংকগুলো এলসি করতে না পারায় আমরা চাহিদা অনুযায়ী এলপিজি আমদানি করতে পারছি না। এর মধ্যে বাজারে সরবরাহের পরিমাণ প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। সামনে এভাবে চলতে থাকলে বাজারে বড় ধরনের সংকট দেখা দেবে। এলপিজি যেহেতু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, তাই অতিদ্রুত বাংলাদেশ ব্যাংককে গুরুত্ব দিয়ে এলসি খোলার ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কম্পানিগুলো, বিপদে পড়ে যাবে ভোক্তারাও।’ঢাকার বাইরেও এলপিজির সরবরাহসংকট : রাজধানী ঢাকার বাইরের বিভাগগুলোতেও এলপিজির সরবরাহসংকট চলছে। চাহিদামতো এলপিজি কিনতে পারছেন না ক্রেতারা। খুচরা ব্যবসায়ীরা সরবরাহসংকট দেখিয়ে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করছেন। ১২ কেজি এলপি গ্যাস সিলিন্ডার খুলনায় খুচরায় বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৪৫০ টাকায়। বরিশালে বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৪০০ টাকায়, ময়মনসিংহে বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৩৫০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকায়। রাজশাহীতে বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৩৭০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকায়। সিলেটে বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৪০০ টাকায়। রংপুরে এক হাজার ৩৫০ থেকে এক হাজার ৩৭০ টাকায় এবং চট্টগ্রামে এক হাজার ৩৫০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

চট্টগ্রামে এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের সরবরাহসংকট দেখা দিয়েছে গত ১২ দিন ধরে। সব কম্পানিই তাদের চাহিদার চেয়ে অনেক কম সরবরাহ দিচ্ছে। এ অবস্থায় এক মাসে তিন দফা দাম বাড়িয়েছেন খুচরা বিক্রেতারা। চট্টগ্রামের বাজারে ১২ কেজি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম এখন এক হাজার ৩৫০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকা।এলপি গ্যাসের চট্টগ্রামের ডিস্ট্রিবিউটর আল মদিনা এন্টারপ্রাইজের মালিক আবু তাহের বলেন, ‘১২ দিন ধরে এই সরবরাহসংকট চলছে। প্রয়োজন ৫০০ সিলিন্ডার, কিন্তু পাচ্ছি ৫০টি। এর পরও আমরা বাড়তি দামে বিক্রি করতে পারছি না। পাইকারিতে চট্টগ্রাম শহরে এক হাজার ২৩০ টাকায় বিক্রি করছি।’ [প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছে ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, বরিশাল, রংপুর ও রাজশাহী অফিস।]


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ