সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ০২:৩৫ পূর্বাহ্ন

ট্রাক ভরে পাহাড়ের লাল মাটি যাচ্ছে ইটভাটায়!

প্রতিনিধির / ৬৩ বার
আপডেট : সোমবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩
ট্রাক ভরে পাহাড়ের লাল মাটি যাচ্ছে ইটভাটায়!
ট্রাক ভরে পাহাড়ের লাল মাটি যাচ্ছে ইটভাটায়!

পৃথিবীর লৌহ দণ্ড বলা হয় লাল মাটির পাহাড়কে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় যার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। এর ওপর ভর করেই প্রকৃতি তার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। অথচ এক শ্রেণির ভূমিদস্যুরা নিজেদের স্বার্থ হাসিলে সেই পাহাড়গুলোকে সাবাড় করছে। টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলায় আজগানা, গোড়াই, তরফপুর, লতিফপুর ও বাঁশতৈল ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে ছোট বড় বেশ কয়েকটি লাল মাটির পাহাড় রয়েছে। তবে সেসব পাহাড়গুলোতেও পড়েছে ভূমি খেকোদের থাবা। নিজস্ব ফায়দা লুটতে পাহাড়ের লাল মাটি কেটে বিক্রি, আবাস্থল গড়ে তোলাসহ নানা স্বার্থে এসব টিলাগুলোকে নির্বিচারে বিলীন করে দিচ্ছে।

বাঁশতৈল ইউনিয়নের পাঁচগাও গ্রামের নিজাম উদ্দিনের ছেলে রোকন মিয়া। তিনি প্রতি বছর প্রশাসনের লোকজনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পাহাড়ি এলাকার টিলা কেটে লাল মাটি বিক্রি করে থাকেন। এ বছরও উপজেলার তরফপুর ইউনিয়নের কদমা, নয়াপাড়া ও বাঁশতৈল ইউনিয়নের গায়রাবেতিল ও অভিরামপুর এলাকায় কয়েকটি ভেকু মেশিন দিয়ে টিলার লাল মাটি কাটছেন। এসব মাটি শত শত ড্রাম ট্রাক দিয়ে বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করছেন তিনি। তার কবল থেকে পাহাড়ি এলাকার টিলা কাটা বন্ধ করতে উপজেলা প্র্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর টাঙ্গাইল অফিসের নেই কোনো অভিযান। প্রতিনিয়ত পরিবেশের ওপর এই আগ্রাসন চললেও কারও যেন মাথাব্যথা নেই।প্রশাসনের নীরব ভূমিকার সুযোগ নিয়ে পাহাড় নিধনযজ্ঞ চালানো হচ্ছে বলে জানা গেছে। এতে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে বেশি। ফলে পাহাড় ধসের ঘটনা বাড়ছে। অন্যদিকে পাহাড়ের শক্ত ভীত দুর্বল হচ্ছে। উজাড় হচ্ছে গাছপালা, ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে পাহাড় কাটা বন্ধ করার নির্দেশনাও আছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন রবিবার মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায় এক অনুষ্ঠানে তুরস্ক ও সিরিয়ার ভয়াবহ ভূমিকম্পের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে এ রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ হচ্ছে। টিলা কাটা বন্ধে বর্তমান সরকার আইন করেছে। তাই কোনোভাবে টিলা কাটা যাবে না। টিলা কাটলে পরিবেশের বিপর্যয় হবে। যারা টিলা কাটবে পুলিশ তাদের অ্যারেস্ট করবে। তাদের জেল-জরিমানা হবে। কিন্তু বাস্তবায়নে এর উদ্যোগ নেই।

সরেজমিন উপজেলার বাঁশতৈল ও তরফপুর ইউনিয়নের গ্রামগুলো ঘুরে দেখা যায়, টিলার মাটি কেটে সমতল করা হচ্ছে। পাশেই অস্থিত্ব হারানোর পাহাড়ের ক্ষত চিহ্ন। কোথাও কোথাও টিলার বুক চিরে সমতল করা জায়গায় স্থানীয় বাসিন্দারা ঘর নির্মাণের কাজে ব্যস্ত। যেন পাহাড় কাটার উৎসবে নেমেছে তারা। সে সঙ্গে টিলায় থাকা গাজারি গাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ নিধন করে ফেলছে। পাহাড়ের ওপরে বসবাসের জন্য নির্মিত কয়েকটি ঘর ও পল্লী বিদ্যুতের খুটিও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। মাটি ভর্তি শত শত ট্রাক চলাচল করায় ধুলায় রাস্তার পাশের গাছপালা ও বাড়ির ঘরের চাল ঢেকে গেছে। ভেতর মালামাল নষ্ট হওয়ায় তা বার বার পরিস্কার করতে হচ্ছে। এমন ভাবে মাটি কাটা হচ্ছে যে, সামান্য বৃষ্টিপাত হলে এসব বাড়ি ঘর ধসে পড়বে। এতে প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন অনেকেই। মাটি লুটেরাদের ভয়ে কেউ প্রকাশ্য মুখ খুলতে পারছেন না। প্রকৃতির বুকে মানুষের এমন থাকায় জীববৈচিত্র্য এখন হুমকির মুখে।

স্থানীয় সচেতন মহল জানান, যেভাবে নির্বিচারে ও অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা হচ্ছে তা জনজীবনে হুমকি স্বরূপ। টিলার তলে কিংবা পাহাড়ে যেসব বাড়িঘর রয়েছে ভারি বর্ষণে যেকোনো মুহূর্তে ধসে যেতে পারে। এতে প্রাণহানির আশংকাও রয়েছে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, টিলার লাল মাটি কাটা বেআইনি কিনা তা আমাদের জানা নেই। বিনা বাধায় কয়েক একর পাহাড় কেটে সাবাড় করা হচ্ছে।

গায়রাবেতিল গ্রামের উত্তরপাড়ার বাসিন্দা আব্দুল হালিম ও তার ছেলে নুর আলম বলেন, পাহাড়ি এলাকায় বিগত ৫-৭ বছর ধরে টিলা কাটা শুরু হয়েছে। আমরাও বাশের ঝাঁড় ও গজারি গাছ কেটে ধানি জমি বানাতে মাটি ব্যবসায়ী রোকন মিয়া ও আবিদ নামে দুইজনকে টিলার মাটি কেটে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছি।বাঁশতৈল ফাড়ির উপ পরিদর্শক (এসআই) নেছার উদ্দিন জানান, পাহাড়ি এলাকার কোথায় লাল মাটি কাটা হচ্ছে না।

বাঁশতেল ফাড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক সাখাওয়াত হোসেন জানান, পাহাড়ি এলাকার টিলার লাল মাটি কাটার বিষয়টি জানা নেই। আপনার সামনে দিয়ে লাল মাটি ভর্তি ট্রাক চলাচল করছে জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দেননি।মাটি ব্যবসায়ী রোকন মিয়া রাগাম্বিত হয়ে বলেন, আমি মাটি কাটি গাড়ি চালায় আপনার সমস্যা কি? আমার নাম নিয়ে কাউকে ফোন দিতে পারবেন না।

পরিবেশ অধিদপ্তর টাঙ্গাইলের উপ পরিচালক জমির উদ্দিন জানান, টিলার লাল মাটি কাটার বিষয় জানা নেই। পত্রিকায় লিখেন। ওই সংবাদ আমাদের দিয়েন। তারপর অভিযান চালানো হবে বলে লাইন কেটে দেন।গোড়াই পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের ডিজিএম মো. মাহবুবুর রহমান জানান, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।মির্জাপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আমিনুল ইসলাম বুলবুল জানান, পাহাড়ি এলাকা এ উপজেলার ঐতিহ্য। টিলার লাল মাটি কাটা সম্পুর্ণ নিষেধ রয়েছে। রাতের আধারে কেউ লাল মাটি কেটে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ