বুধবার, ২৯ মে ২০২৪, ০২:৩১ পূর্বাহ্ন

১০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীও নির্ভুল বাংলা ব্যবহার করেন না

প্রতিনিধির / ৮৮ বার
আপডেট : মঙ্গলবার, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩
১০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীও নির্ভুল বাংলা ব্যবহার করেন না
১০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীও নির্ভুল বাংলা ব্যবহার করেন না

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, সমালোচক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের পর কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন। এখন অধ্যাপনা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে।তরুণ প্রজন্মের ভাষাজ্ঞান ও বাংলা ভাষার ব্যবহার প্রসঙ্গ নিয়ে মুখোমুখি হন।

যে অর্জনটি আমাদের আরও বেশি তৃপ্তি দিতো, তা হচ্ছে আমরা যদি মাতৃভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম করতে পারতাম। একেবারে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত যদি আমরা বাংলা ভাষাকে ব্যবহার করতে পারতাম, তাহলে আরও সমৃদ্ধ হতো। জার্মান, জাপান, রাশিয়াতে এমনটিই করা হয়

সাহিত্যে বিচরণ করছেন দীর্ঘকাল। লিখছেন, গবেষণা করছেন শিক্ষা, ভাষা, সংস্কৃতির নানা দিক নিয়ে। তরুণ প্রজন্মের ভাষাশিক্ষা ও ব্যবহার প্রসঙ্গে কী বিশ্লেষণ করবেন?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: বাংলা ভাষার অর্জন আমাদের একটি অমর ইতিহাস। আমাদের বড় অর্জন সংবিধান বাংলা ভাষায় রচিত। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে বাংলায় বক্তব্য দিয়েছেন। ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এই অর্জনগুলো দৃশ্যমান এবং গর্ব করার মতো যথেষ্ট কারণ আছে।নিঃসন্দেহে পৃথিবীর আর কোনো রাষ্ট্র ভাষা নিয়ে এমন অর্জন দেখাতে পারবে না। ভাষা দিয়ে একটি রাষ্ট্রের পরিচিতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যে অর্জনটি আমাদের আরও বেশি তৃপ্তি দিতো, তা হচ্ছে আমরা যদি মাতৃভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম করতে পারতাম। একেবারে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত যদি আমরা বাংলা ভাষাকে ব্যবহার করতে পারতাম, তাহলে আরও সমৃদ্ধ হতো। জার্মান, জাপান, রাশিয়াতে এমনটিই করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে সেটা সম্ভব হয়নি।উচ্চশিক্ষা না হয় অনেক দূরের কথা। আমাদের স্কুলে-কলেজেও বাংলা ভাষার সঠিক শিক্ষা নেই।

উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যারা আসছেন, তারাও শতকরা ১০ শতাংশের বেশি নয়, যারা নির্ভুলভাবে বাংলা ভাষা ব্যবহার করতে পারেন। স্বাধীনতার এত বছর পরেও যদি বাংলা ভাষা ব্যবহারে এমন দৈন্য থাকে তাহলে বুঝতে আমাদের ভাষা শিক্ষায় মস্ত বড় গলদ রয়েছে।সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: বেশ কয়েকটি কারণের মধ্যে আমি চারটি কারণ উল্লেখ করবো, যা আমাদের ভাষা শিক্ষায় অন্তরায় বলে মনে করি।

প্রথমত, আমরা আমাদের বাংলা ভাষা নিয়ে ইতিবাচক উৎসাহ দেখাইনি। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালের পর থেকে মনে হয়েছে ভাষা নিয়ে আমাদের অর্জন ঠিক হয়ে গেছে। ভাষা নিয়ে আর কোনো চিন্তার কারণ নেই।খেয়াল করে দেখবেন, বাংলা ভাষা ও ইংরেজি ভাষার মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। এটি আগে ছিল না। পাকিস্তান আমলেও ছিল না। স্বাধীনতার পর ইংরেজি ভাষার ব্যবহার প্রবলভাবে বাড়ে। উচ্চবিত্তরা নিয়ে নিলো ইংরেজি মাধ্যম। সাধারণেরা বাংলা।

আর সাধারণ মানুষদের বড় একটি অংশ মাদরাসা শিক্ষায় ঝুঁকে পড়লো। মাদরাসা শিক্ষায় শিক্ষিতরা যদি জ্ঞান-বিজ্ঞানে এগিয়ে যেতে পারতো, তাহলে দোষের ছিল না।

প্রথমত মনে করা হয়, গরিবের সন্তানেরাই মাদরাসা শিক্ষায় আসবে। তাদের সামান্য কিছু শিক্ষা দিলেই চলবে। মাদরাসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রচুর মেধাবী আছেন। তাদেরও ডাক্তার বা রকেট সায়েন্স পড়ার অধিকার আছে। কিন্তু কী শেখানো হচ্ছে সেখানে, তা ভাবতে হবে। মাদরাসায় বাংলা ভাষাও ঠিক ভালো করে শেখানো হয় না। ইংরেজিটাও শেখানো হয় না। এমন একটি বিদেশি ভাষা শেখানো হয়, যার প্রায়োগিক ক্ষেত্র তেমন নেই।আরবিতেও যদি খুব উচ্চশিক্ষিত আলেম তৈরি করতে পারতো, তাহলেও অনেক কাজে আসতো। আলেম মানে জ্ঞানী। এক সময় খুব জ্ঞানীরা মাদরাসা থেকে বের হতেন। অনেক বিচারপতি ছিলেন মাদরাসার শিক্ষার্থী। আমার বাবার আমলের কথা বলছি। বাবাও মাদরাসায় শিক্ষিত ছিলেন। কিন্তু বাবার বাংলা ভাষা এবং ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা ছিল স্পষ্ট। ওই সময় সব ভাষার ওপর দক্ষতা অর্জন করা হতো।

বাংলা ভাষা ও ইংরেজি ভাষার মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। এটি আগে ছিল না। পাকিস্তান আমলেও ছিল না। স্বাধীনতার পর ইংরেজি ভাষার ব্যবহার প্রবলভাবে বাড়ে। উচ্চবিত্তরা নিয়ে নিলো ইংরেজি মাধ্যম। সাধারণেরা বাংলারাষ্ট্র চাইলে সমস্ত শিক্ষা মাতৃভাষার মাধ্যম করতে পারে। উদ্যোগ নেওয়ার ব্যাপার। পাঠ্যবই অনুবাদ করলেই হয়ে যায়। প্রথম থেকেই আমরা উদাসীন ছিলাম এবং এ কারণেই তিন ধারার শিক্ষা জারি হলো।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে শিক্ষকদের সঠিক মূল্যায়ন না করা। শিক্ষকদের বরাবই দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক মনে করা হয়। প্রশাসনের লোকেরা হচ্ছেন প্রথম শ্রেণির নাগরিক। রাষ্ট্রীয় আচারগুলোতে দেখবেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা পেছনের সারিতে জায়গা পাচ্ছেন। এ কারণেই আমি কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে যোগ দেই না। আমি সচেতনভাবে এসব বর্জন করে চলি।

রাষ্ট্র, সমাজ শিক্ষকদের সঠিক মূল্যায়ন করলে জাতির এমন দশা হওয়ার কথা ছিল না। একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষককে যদি ৭০ হাজার টাকা বেতন দেওয়ার পাশাপাশি বাড়ি দেওয়া হয়, তাহলে দেখবেন সবচেয়ে মেধাবীরা সেখানকার শিক্ষক হবেন। তারা সব ভাষাতেই শিক্ষা দিতে পারবেন। যারা বাংলা ভালো বলতে পারেন, তারা ইংরেজিও ভালো বলতে পারেন। আপনি অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আবু হেনা মোস্তাফা কামাল বা হুমায়ুন আজাদের দিকে তাকান। তারা বাংলা, ইংরেজি কত সুন্দর করে বলেন। এখন বড় ফারাক হয়ে গেছে। এখন মুখস্ত করে ভাষার ব্যবহার করা হয়।

শিক্ষকদের বরাবই দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক মনে করা হয়। প্রশাসনের লোকেরা হচ্ছেন প্রথম শ্রেণির নাগরিক। রাষ্ট্রীয় আচারগুলোতে দেখবেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা পেছনের সারিতে জায়গা পাচ্ছেনতৃতীয় কারণ হচ্ছে, ভাষার ক্ষেত্রে ইংরেজির যে আধিপত্য তার নিচে বাংলা ভাষা চাপা পড়ে গেছে। মনে করা হয়, ইংরেজি না জানলে বাঁচার আর কোনো পথ নেই। এক সময় বিসিএসের প্রশ্ন ইংরেজিতে করা হতো। আমি বললাম, ইংরেজির দরকার কী? একটি ব্যাংকের চাকরির প্রশ্ন ইংরেজিতে করার দরকার কী?

মনে করা হয়, যে ইংরেজি ভালো জানে, সে অনেক জ্ঞানী, স্মার্ট। ভালো বাংলা বললে চাকরিতে নেওয়া হয় না। ইংরেজি ভুলভাল বললেও চাকরি দেওয়া হয়। ভাষার ক্ষেত্রে এই দ্বিমুখী আচরণ দীর্ঘকাল থেকে হয়ে আসছে।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: অবশ্যই চ্যালেঞ্জ বাড়িয়েছে। ভালো বাংলা বলতে পারলেও আপনাকে পাত্তা দেওয়া হচ্ছে না। আবার দু’কলম ইংরেজি বলেও সে অফিসার বনে যাচ্ছে। এটি বাংলা ভাষার চ্যালেঞ্জ বাড়িয়েছে বৈকি! মাতৃভাষা ভালো জেনে ইংরেজিতে সুবিধা করা যায় না। ভাষা নিয়ে আমাদের আচরণ প্রমাণিত দ্বিমুখী। মুখে মুখে আমরা বাংলা ভাষার প্রতি যতেই দরদ দেখাই, বাস্তবে ভিন্ন।

চতুর্থ কারণ হচ্ছে বাংলা ভাষার প্রতি পরিবারগুলোর উদাসীনতা। পাঠ্যবইয়ে যদি বাংলা ভাষা ভালো করে না পড়ে, তাহলে কিছু শিখলো না। ফেসবুক বা টিকটক তো ভাষা শেখায় না। এখন সবাই নকলে অভ্যস্ত। ফেসবুক বা টিকটিকে ‘হে ব্রো’ বলে শুরু করলো, আর সেটাই ভাষা হয়ে গেলো। বলা হয়, ‘আমি হচ্ছে, এটি বুঝতে পারছি না।’ এটি কোনো বাক্য হতে পারে না। হবে ‘আমি হচ্ছি’। টেলিভিশনগুলোতে যখন উপস্থাপনা করা হয়, তখন ‘কিন্তু’ আর ‘আসলে’ নামের দুটি লাঠির ওপর ভরে করে চলে। শত শত বার এই শব্দ দুটি ব্যবহার করা হয়। অদ্ভুত! দশ মিনিট কথা বলতেই হাঁসফাস। আর ফেব্রুয়ারি মাসেই আমরা এ যন্ত্রণাগুলো নিয়ে নাড়াচড়া দেই। বছরের অন্য সময় খবর রাখি না।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: আপনি অন্যকে সম্মান করতে না পারলে, অন্য আপনাকে সম্মান করবে না। আমরা তো দেশের মধ্যে থাকা অন্য মাতৃভাষাকে মর্যাদা দিতে পারিনি। অনেক ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। এতদিন পরে এসে চাকমা ভাষা, মারমা ভাষা, ত্রিপুরা ভাষায় শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বেশির ভাগ বাংলাতেই নির্দেশিকা দেওয়া আছে। এই দায়সারা উদ্যোগ নিয়ে আপনি একটি মাতৃভাষাকে রক্ষা করতে পারবেন না। আমাদের নিজের ভাষার প্রতি আবেগ থাকলে অন্যের ভাষার প্রতি সম্মান থাকতো। ভাষার প্রতি আমাদের এক ধরনের জাগতিক মোহ ছাড়া আর কিছুই নেই।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ