বুধবার, ২২ মে ২০২৪, ০১:৩৬ অপরাহ্ন

যুগ্ম সচিব এনামুল হকের কথায় র‌্যাব জেসমিনকে আটক করে

প্রতিনিধির / ১৩৫ বার
আপডেট : শনিবার, ১ এপ্রিল, ২০২৩
যুগ্ম সচিব এনামুল হকের কথায় র‌্যাব জেসমিনকে আটক করে
যুগ্ম সচিব এনামুল হকের কথায় র‌্যাব জেসমিনকে আটক করে

ঘটনার দিন ২২ মার্চ নওগাঁর মুক্তি মোড় থেকে র‌্যাবের ডিএডি মাসুদের নেতৃত্বে র‌্যাব-৫-এর সিপিসি-২-এর টিমটি সুলতানা জেসমিনকে আটক করে। তাকে আটকের বিষয়ে জয়পুরহাট সিপিসি-২-এর প্রধানের কোনো নির্দেশনা ছিল না। যুগ্ম সচিব এনামুল হকের কথায়ই র‌্যাবের ঐ টিম সুলতানা জেসমিনকে আটক করে। র‌্যাব জয়পুরহাট ক্রাইম প্রিভেনশন কোম্পানির প্রধান মেজর মোস্তফা জামান ও সেকেন্ড-ইন-কমান্ড অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাসুদ রানাসহ ১১ র‌্যাব সদস্যকে গতকাল শুক্রবার রাজশাহীতে র‌্যাব-৫-এর কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে র‌্যাবের তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটির সদস্যরা তাদের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেছেন।

র‌্যাবের তদন্ত কমিটি জয়পুরহাট ক্রাইম প্রিভেনশন কোম্পানির প্রধান মেজর মোস্তফা জামানের কাছে মামলা ছাড়াই মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে একজন সরকারি নারী কর্মচারী জেসমিন সুলতানাকে আটক করার কারণ জানতে চায়। তদন্ত কমিটি জানতে পেরেছে, ঐ নারীকে আটকের বিষয়ে জয়পুরহাট সিপিসি-২-এর প্রধানের কোনো নির্দেশনা ছিল না। ঐ নারী অসুস্থ হওয়ার পর জয়পুরহাট সিপিসি প্রধান বিষয়টি জানতে পারেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত যুগ্মসচিব এনামুল হকের কথায়ই র‌্যাব জেসমিন সুলতানাকে আটক করে। এর আগে গত ১৯ ও ২০ মার্চ যুগ্মসচিব এনামুল হক ঐ নারীর সন্ধানে নওগাঁ গিয়েছিলেন। যুগ্মসচিবের অভিযোগ, তার ফেসবুক আইডি হ্যাক করে একটি চক্র চাকরি দেওয়ার নামে লাখ লাখ টাকা প্রতারণা করেছে।

র‌্যাবের তদন্ত কমিটি সিসি ক্যামেরার বেশ কয়েকটি ফুটেজ জব্দ করেছে। এর মধ্যে নওগাঁ জেনারেল হাসপাতালে র‌্যাবের গাড়িতে করে কীভাবে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেই ভিডিও ফুটেজ জব্দ করেছে। নওগাঁর মুক্তির মোড় থেকে জেসমিনকে গাড়িতে তোলার পর একটি কম্পিউটারের দোকানে নিয়ে যায় র‌্যাব সদস্যরা। ঐ দোকান থেকে বের হওয়ার পর তিনি হেঁটে গাড়িতে ওঠার দৃশ্যও ভিডিও ফুটেজে ধরা পড়েছে। ঐ সময় যুগ্মসচিবের সরকারি গাড়িও দেখা গেছে।

অন্যদিকে, জেসমিন সুলতানার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করেছে। সোনালী ব্যাংক নওগাঁর মহাদেবপুর শাখায় জেসমিন সুলতানার ব্যাংক স্টেটমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, চলতি বছরের ২ জানুয়ারি থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা পড়েছে ২৮ লাখ ১১ হাজার ৪৬২ টাকা। এই সময়ের মধ্যে তার অ্যাকাউন্ট থেকে ২৬ লাখ ২৪ হাজার টাকা বিভিন্ন সময়ে উত্তোলন করা হয়েছে। বেশির ভাগ টাকা উত্তোলন করা হয় মার্কেন্টাইল ব্যাংক নওগাঁ শাখার এটিএম কার্ডের মাধ্যমে। প্রতিদিন এই কার্ড দিয়ে ২০ হাজার টাকা করে উত্তোলন করা হয়। চেকের মাধ্যমেও টাকা তোলা হয়েছে। ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা জয়পুরহাটের কালাই উপজেলা থেকে, ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা কালাই উপজেলা থেকে জনৈক আব্দুল্লাহর নামে উত্তোলন করা হয়েছে। মোট ১৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা উত্তোলন হয়েছে চেকের মাধ্যমে। বর্তমানে তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা জমা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিভিন্ন পদে চাকরির কথা বলে জেসমিন সুলতানার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মাত্র ৩৪ দিনে ২৮ লাখ টাকা জমা পড়েছে। এই সময়ের মধ্যে ২৬ লাখ টাকা যারা উত্তোলন করেছেন, তাদের একটি তালিকা করেছে র‌্যাবের তদন্ত কমিটি।সূত্রটি আরও জানায়, যুগ্মসচিব এনামুল হকের মোবাইল ফোনের কললিস্ট যাচাই করছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা। এমনকি জেসমিন সুলতানার মোবাইল ফোনের কল রেকর্ডিং যাচাই করা হচ্ছে। জেসমিন সুলতানার সঙ্গে ভিন্ন নম্বর দিয়ে যুগ্মসচিবের একাধিকবার মোবাইল ফোনে কথোপকথন হয়েছে। এসব কথায় জেসমিন সুলতানার সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে গোয়েন্দা সংস্থা।

তবে যুগ্মসচিব এনামুল হক রাজশাহীতে কর্মরত সাংবাদিকদের কাছে জানান, ২০২২ সালের মার্চ মাসে তার ফেসবুক আইডি হ্যাক হয়। ঐ বছরের ২২ মার্চ তিনি রাজপাড়া থানায় একটি জিডি করেন। তার ফেসবুক আইডি ফিরে পেতে তিনি রাজশাহীতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেওয়ার চেষ্টা করেন। তার ফেসবুক আইডি ব্যবহার করে একটি চক্র চাকরি প্রদানের নামে প্রতারণা করছে। প্রতারক চক্রটি জেসমিন সুলতানার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে। এজন্য তিনি নওগাঁতে জেসমিন সুলতানাকে খুঁজছিলেন। ঘটনার দিন তিনি নওগাঁতে গিয়ে ঐ নারীর সন্ধান পাওয়ার পর র‌্যাবের টহল টিমের কাছে ঐ নারীকে আটক করার কথা জানায়। র‌্যাব ঐ নারীকে আটক করে একটি কম্পিউটারের দোকানে নিয়ে যায়। তার মোবাইল ফোন থেকে কথোপকথন ও কললিস্টের স্ক্রিনশট নিয়ে সেগুলো প্রিন্ট করা হয়।

এসব বিষয়ে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, র‌্যাবের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি জয়পুরহাট সিপিসি-২-এর ১১ জন সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তদন্ত কমিটি রাজশাহীতে যুগ্মসচিব ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের বক্তব্যও গ্রহণ করবে। তদন্ত কমিটির দেওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী র‌্যাব ব্যবস্থা নেবে।

গত ২২ মার্চ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শহরের মুক্তি মোড় এলাকা থেকে সুলতানা জেসমিনকে আটক করে র‌্যাব সদস্যরা। এক দিন পর রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের যুগ্মসচিব এনামুলক হক রাজপাড়া থানায় আল আমিন ও সুলতানা জেসমিনকে আসামি করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন। ২৪ মার্চ সকালে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জেসমিনের মৃত্যু হয়। জেসমিন নওগাঁ সদর উপজেলার চণ্ডীপুর ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ের অফিস সহকারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এছাড়া নওগাঁ জেলা ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী কল্যাণ সমিতির নির্বাহী সদস্য ছিলেন তিনি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ