বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ০৭:৪৫ অপরাহ্ন

লবণ উৎপাদনে রেকর্ড, দামেও রেকর্ড

প্রতিনিধির / ১৮৮ বার
আপডেট : বুধবার, ২৮ জুন, ২০২৩
লবণ উৎপাদনে রেকর্ড, দামেও রেকর্ড
লবণ উৎপাদনে রেকর্ড, দামেও রেকর্ড

কোরবানির ঈদের সময় প্রতিবছর লবণের দাম ও সরবরাহ নিয়ে কমবেশি জটিলতা দেখা দেয়। এবারও সেই পুরোনো পথেই হাঁটছে লবণের বাজার। কোরবানির আগেই বেড়েছে অপরিশোধিত লবণের দাম। গত তিন-চার দিনের ব্যবধানে প্রতি বস্তায় ১০০ টাকার বেশি বেড়েছে।

চামড়া খাতের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, উৎপাদন ও মজুতে ঘাটতি না থাকলেও কোরবানি ঘিরে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মধ্যস্বত্বভোগীরা। এতে লবণের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে এ ব্যাপারে বারবার অনুরোধ করেও কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।তবে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) বলেছে, এবার কোরবানির সময় কত টন লাগতে পারে, সেই হিসাব করে প্রয়োজনীয় লবণ সব জেলায় সরবরাহ করা হয়েছে। ডিলারদের কাছে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তার পরও কোথাও ঘাটতি দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে সরবরাহ করা হবে।

বিসিক সূত্রে জানা গেছে, ২০২২-২৩ মৌসুমে দেশে ২২ লাখ ৩২ হাজার টন লবণ উৎপাদন হয়েছে, যা লবণ উৎপাদনে ৬২ বছরে সর্বোচ্চ। এ ছাড়া উদ্বৃত্ত রয়েছে আগের মৌসুমের লবণও। শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, দেশে বছরে ২২ থেকে ২৩ লাখ টন লবণের প্রয়োজন হয়। তবে চামড়া খাতের ব্যবসায়ীদের তথ্য মতে, শুধু কোরবানির সময় পশুর চামড়া সংরক্ষণে লবণের দরকার হয় দেড় থেকে দুই লাখ টনের। উৎপাদনের হিসাবে বর্তমানে কৃষক, মিলার এবং ব্যবসায়ী পর্যায়ে কয়েক লাখ টন লবণ উদ্বৃত্ত রয়েছে। সেই হিসাবে এ মুহূর্তে লবণের ঘাটতি হওয়ার কথা নয়, অথচ দাম বেড়েই চলেছে।সাধারণত পশু জবাই করে চামড়া আলাদা করার পর ছয় থেকে সাত ঘণ্টার মধ্যে চামড়ায় লবণ দিতে হয়। তা না হলে চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। আর এই সুযোগ লুফে নেন লবণের সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা। চাহিদা বেশি থাকায় তাঁরা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়িয়ে দেন। এতে সময়মতো লবণের সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারায় অনেক পশুর চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। ফলে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয় চামড়া ব্যবসায়ীদের। তবে লবণ মজুত করে না রাখায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন মৌসুমি কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীরা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চামড়া খাতের ব্যবসায়ীরা বারবার অনুরোধ করেছিলেন এবার যেন লবণের দাম না বাড়ানো হয়। শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মো. টিপু সুলতান সমকালকে বলেন, ‘এবারও সিন্ডিকেট করে ব্যবসায়ীরা লবণের দাম বাড়িয়েছেন। প্রতিবছরই কোরবানির সময় তাঁরা এমনটা করেন। বিষয়টি বরাবরই আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জানাই। তবে তাতে কোনো লাভ হয় না।’বাজারে সাধারণত ৫০, ৫৫ ও ৭৪ কেজি ওজনের অপরিশোধিত লবণের বস্তা বেশি পাওয়া যায়। তবে কোরবানির সময় বেশি বেচাকেনা হয় ৭৪ কেজি ওজনের বস্তা। এ ধরনের বস্তায় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা দাম বেড়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, গত বছর এক বস্তা (৭৪ কেজি) লবণের দাম ছিল ৮৫০ থেকে ১ হাজার টাকা। এ বছর কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকা।
এ ব্যাপারে লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি নুরুল কবির বলেন, ৬২ বছরে উৎপাদনের রেকর্ড যেভাবে হয়েছে, ঠিক সেভাবে দামেও ৬২ বছরে সর্বোচ্চ। এত দাম কখনোই হয়নি। চাষি ও মিলারদের কাছে লবণ নেই। এখন সবচেয়ে বেশি আছে মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে। তারাই দামের নাটাই ঘোরাচ্ছে।

তিনি বলেন, কক্সবাজারে এখনও প্রায় ছয় থেকে সাত লাখ টন লবণ পড়ে আছে। সেগুলো কেন সরবরাহ করা হচ্ছে না। এর পেছনে কারা জড়িত, খুঁজে বের করা সরকারের দায়িত্ব। কক্সবাজারের সিন্ডিকেট এবং আমদানির অনুমতি না দেওয়ার কারণে এখন লবণের বাজারে অস্থিরতা।এ দিকে অন্য বছরের মতো এবারও কোরবানির সময় লবণের সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে বিসিক কর্তৃপক্ষ। বিসিক সূত্রে জানা গেছে, কোরবানির পশুর চামড়া স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং নিরবচ্ছিন্ন লবণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে ১৯ সদস্যের একটি কেন্দ্রীয় তদারকি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি কোরবানির পশুর চামড়া যথানিয়মে সংগ্রহ, লবণ প্রয়োগে স্থানীয় পর্যায়ে সংরক্ষণ ও কাঁচা চামড়া ব্যবস্থাপনায় তদারকি করবে। এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে চামড়া সংরক্ষণের জন্য ন্যায্যমূল্যের নিরবচ্ছিন্ন লবণ সরবরাহ নিশ্চিত করবে। পশুর চামড়া সংরক্ষণ ও লবণ সরবরাহ নিয়ে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেবে কমিটি।

কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, কোরবানি উপলক্ষে লবণের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বেচাকেনার ধুম পড়েছে কক্সবাজারে। এ কারণে স্থানীয় বাজারে হঠাৎ লবণের দাম বেড়ে গেছে। লবণ চাষি ও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গত তিন দিনে প্রতি মণে দাম বেড়েছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। বর্তমানে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় গর্ত থেকে তুলে মাঠপর্যায়ে প্রতি মণ লবণ বিক্রি হচ্ছে ৪৮০ থেকে ৪৯০ টাকায়, যা তিন দিন আগে ছিল ৪৩০ থেকে ৪৪০ টাকা। তবে মে মাসে লবণের মণ বিক্রি হয়েছে ৩৮০ থেকে ৩৯০ টাকা। ঈদ পর্যন্ত দাম আরও ১০ থেকে ৩০ টাকা বাড়তে পারে।

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রামের মাঝিরঘাটের ৩৭টি লবণ মিল পরিদর্শন শেষে বাজারে পর্যাপ্ত লবণ মজুত থাকার বিষয়টি জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। তাই কোরবানিতে লবণ ঘাটতির অজুহাত দেখানোর কোনো সুযোগ নেই বলে মনে করছেন তাঁরা। গতকাল মঙ্গলবার মাঝিরঘাটের লবণ মিলে অভিযান শেষে এমন পর্যবেক্ষণের কথা জানান ম্যাজিস্ট্রেটরা। অভিযানে নেতৃত্ব দেন সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. তৌহিদুল ইসলাম ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হুসাইন মুহাম্মদ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ