টাঙ্গাইলের মধুপুরের আনারস, কলা, হলুদ, ড্রাগন, কফি আর লেবু চাষে সফলতার পর এবার এই অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে শুরু হয়েছে কাজু বাদামের চাষ। এখানকার পাহাড়ি এলাকার লাল মাটি কৃষি বৈচিত্রের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।আবহাওয়া ও মাটির গুণাগুণ কাজু বাদাম আবাদের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ দেখা দিয়েছে।
বিগত কয়েক বছর ধরে পরীক্ষামূলক চাষের পর, চলতি মৌসুমে মধুপুরের পাহাড়ি লাল মাটিতে কাজু বাদামের ভালো ফলন হয়েছে। ফলে এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে কাজু বাদামকে ঘিরে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হতে যাচ্ছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, মধুপুর গড়াঞ্চলের মাটি মূলত লাল বর্ণের এবং অল্মীয়। এই মাটিতে প্রচুর পরিমাণে আয়রন এবং অ্যালুমিনিয়াম থাকে, যা কাজু বাদাম গাছের দ্রুত বৃদ্ধি ও পুষ্টির জন্য অত্যন্ত সহায়ক। এছাড়া কাজু বাদাম চাষের প্রধান শর্ত হলো জমিতে পানি জমে থাকা যাবে না।
এখানকার পাহাড়ি এলাকার উঁচু জমি হওয়ায় এখানে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা চমৎকার। এখানকার আবহাওয়া অতিরিক্ত গরম বা অতিরিক্ত শীত না হওয়ায়, তা কাজু গাছের ফুল ও ফল আসার জন্য একেবারে আদর্শ পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। প্রথম বছরেই আশাতীত ফলন পেয়ে এলাকার অনেক কৃষকই এখন কাজু ঝুঁকছেন বাদাম চাষে ।
কৃষক আফাজ উদ্দিন বলেন, প্রথমে যখন শুনলাম পাহাড়ি লাল মাটিতে কাজু বাদাম হইবো, তখন একটু ভরসা পাই নাই। পরে কৃষি কর্মকর্তাদের কথায় সাহস কইরা দুই বিঘা জমিতে চারা রোপণ করি। প্রথম বছরেই গাছে যে পরিমাণ ফলন আইছে, তা দেইখা আমি নিজেই অবাক। এই বাদামের দামও ভালো। আমাগো এই এলাকার অনেক চাষিই এখন আনারস-কলার পাশাপাশি কাজু বাদাম চাষের সিদ্ধান্ত নিছে।
মধুপুর উপজেলার শোলাকুড়ি ইউনিয়নের আরেক কৃষক সজীব মিয়া বলেন, কাজু বাদামের সবচেয়ে বড় সুবিধা হইলো একবার চারা রোপন করলে ৩৫ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। বারবার চারা কেনার খরচ নাই, আবার পরিচর্যাও অন্য ফসলের চেয়ে কম। আমার পাহাড়ি উঁচু জমিগুলাতে আগে তেমন কিছুই হইতো না, এবার সেখানে কাজু বাদাম লাগাইয়া ভালো লাভ আশা করতাছি।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট(বারি) গাজীপুর-এর মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আলতাফ হোসেন বলেন, দেশের পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে,বিশেষ করে টাঙ্গাইলের মধুপুর ও পার্বত্য জেলাগুলোতে যদি কাজু বাদামের বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ ঘটানো যায়, তবে তা দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার পাশাপাশি আমদানি নির্ভরতা শূন্যে নামিয়ে আনবে। এতে করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধুপুরের লাল মাটি কাজু বাদাম চাষের জন্য বিপুল সম্ভাবনা দেখিয়েছে, তা ধরে রাখতে এখন প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে যদি এই অঞ্চলে বাদাম প্রক্রিয়াজাত করার উদ্যোগ নেওয়া হলে মধুপুরের এই লাল মাটি থেকে কৃষকরা অচিরেই ‘সোনালী ফসল’ ঘরে তুলবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এটি এক বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে।
বর্তমানে মধুপুরের মাটিতে কাজু বাদাম আবাদে কৃষকদের সার্বিক তথ্য ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সরেজমিন গবেষণা বিভাগের কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে বারি টাঙ্গাইলের সরেজমিন গবেষণা বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আশিকুর রহমান জানান, আমরা মাঠপর্যায়ে কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও মানসম্মত চারা সরবরাহ করছি। মধুপুরের মাটি ও জলবায়ু কাজু চাষের জন্য এক আশীর্বাদ। কৃষকেরা যেন সঠিক উপায়ে বালাই ব্যবস্থাপনা ও পরিচর্যা করতে পারেন, সেজন্য আমাদের টিম সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছে।