নদী খননের মাটিতে চাপা পড়েছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর, দিশেহারা গৃহহীনরা

খুলনার ডুমুরিয়ার তিনটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের অসংখ্য ঘর নদী খননের মাটিতে চাপা পড়েছে। নদী খনন করতে গিয়ে যত্রতত্র মাটি ফেলার কারণে কোথাও ঘরগুলোর ওপর আস্ত মাটির পাহাড় তুলে দেওয়া হয়েছে, আবার অপরিকল্পিতভাবে ড্রেজিংয়ের কারণে নদীগর্ভে ধসে পড়ার হুমকিতে পড়েছে প্রকল্পের বহু ঘর। নষ্ট হয়েছে বেশকিছু টিউবওয়েল, ভেঙেছে টয়লেট।

উপজেলার চুকনগর, কাঁঠালতলা এবং খর্নিয়া এলাকার সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্প লাগোয়া ভদ্রা নদী খননের কাজ শুরু হওয়ায় বিপাকে পড়েছে এখানকার বসবাসকারীরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, যশোর-ভবদহ ও খুলনা অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে ভদ্রাসহ ৬টি নদীর সাড়ে ৮১ কিলোমিটার খনন কাজ চলছে। চুকনগর থেকে বরাতিয়া পর্যন্ত ভদ্রা নদীর পাড়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পের প্রায় ৪০০ ঘর রয়েছে। নদী খননের মাটি রাখার ফলে এসব ঘরের অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে ছিন্নমূল পরিবারগুলো।

ভুক্তভোগীরা জানান, নদী থেকে তোলা পলিমাটির প্রচণ্ড চাপে তার ঘরের পেছনের দেয়াল ও জানালা ভেঙে ভেতরে কাদা ঢুকে গেছে। নদী খননের মাটি যেভাবে ঘরের গা ঘেঁষে স্তূপ করে রাখা হয়েছে, তাতে যেকোনো মুহূর্তে পুরো ঘর ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রচণ্ড গরমে একদিকে যেমন ঘরে থাকার উপায় নেই, অন্যদিকে মাটির ভারে ঘরের দেয়াল ও মেঝেতে ফাটল ধরেছে। তাদের খাবার রান্না করার জায়গা নেই। শিশুদের নিয়ে ঘুমানোর নিরাপদ আশ্রয় নেই।

তারা আরও জানান, এই নদী খনন কর্মসূচিতে কাঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের মানুষদের খাবার পানির জন্য তিনটি টিউবওয়েল এর মধ্যে দুটিই ইতোমধ্যে নষ্ট হয়েছে। বেশিরভাগ ঘরের মানুষদের টয়লেট ভেঙে দেওয়া হয়েছে খননের সময়ই। খর্নিয়া ও কাঠালতলা এলাকার বেশ কয়েকটি পরিবারের মানুষ তাদের ঘরের খাট, হাঁড়ি-পাতিলসহ যৎসামান্য আসবাবপত্র আছে তাও বাইরে বের করে খোলা আকাশের নিচে এনে রেখে প্রহর গুনছেন কখন তার শেষ সম্বলটুকু ভেঙে পড়বে।

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা তপতি দাস বলেন, আমাদের এখানে মাটি চাপা দেওয়ার পর খুব কষ্টে আছি। পেছনে যে ঘরগুলো আছে, সবার টয়লেট বন্ধ। ট্যাংকিগুলো মাটিতে ভরে গেছে। রান্না খাওয়া বন্ধ। বাইরে ইট পেতে রান্না করতে হচ্ছে। এরমধ্যে বৃষ্টি হলে রান্না একেবারে বন্ধ। ছেলে-মেয়েদের মুখে ঠিকমতো খাবার দিতে পারছি না।

তিনি আরও বলেন, ‘রাতের বেলায় গরমে অসুস্থ হয়ে পড়তে হচ্ছে, দিনেও কাজে যেতে পারি না। সবাই অসুস্থ হয়ে পড়ছি। আমরা খুব সমস্যার ভেতরে আছি।’

ডুমুরিয়া বরাতিয়া এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, জানুয়ারি মাস থেকে নদী খননের কাজ শুরু হয়। হঠাৎ কয়েকদিন ধরে মাটির পাহাড় হয়ে গেল। তারা এমনভাবে মাটিগুলো রেখেছে, ঘরগুলো ভেঙে গেছে, বাথরুমের ট্যাংকিগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। ওয়ালে মাটির চাপ পড়ে ফেটে গেছে। ভেকু গাড়ি যখন মাটি সরায় তখন ঘরগুলো কাঁপতে থাকে। এখানকার সবাই হতদরিদ্র।

আশ্রয়ণের বাসিন্দা চামেলী দাস বলেন, নদী খননের মাটির চাপে ঘরগুলো ভেঙে যাচ্ছে। ঘরের পেছনে যেগুলো বাথরুম আছে, সব ভেঙে গেছে। আর আমি অসুস্থ, পেটে টিউমার হয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় এই গরমে আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছি। শিশুরা পড়াশোনা করতে পারে না।

প্রকল্প এলাকার বাসিন্দা বেবি বেগম বলেন, টিনের চাল ভেঙে গেছে। মাটির কারণে রান্নার পরিবেশ নেই, টয়লেটে যাওয়ার মতো অবস্থা নেই। এই অবস্থায় আমরা কীভাবে এখানে বসবাস করব? বিকল্প ব্যবস্থায় রান্না করেছি। এখানে বিদ্যুতের ব্যবস্থাও নেই। বিদ্যুৎ না থাকায় প্রচণ্ড গরমে ছেলে-মেয়েরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে।

খর্নিয়া এলাকার দিনমজুর আব্দুল জলিল বলেন, নদী কাটার সময় মেশিন দিয়ে ঘরের একদম গোড়া পর্যন্ত গর্ত করা হয়েছে। একটু বৃষ্টি হলেই ঘরগুলো নদীতে ধসে পড়বে। আমরা গরিব মানুষ, আমাদের তো আর যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। বাথরুম সব ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তিনটি পানি খাওয়ার কল ছিল, নষ্ট হয়ে গিয়েছে ২টি। এখন ২৬ পরিবারের একমাত্র ভরসা একটি টিউবওয়েল।

একই প্রকল্প এলাকার বাসিন্দা মুন্নি বেগম বলেন, রান্নাঘর, টিন, বাথরুম ভেঙে মাটিতে ভরে গেছে। চার-পাঁচদিন ধরে এই অবস্থা। রান্না করতে সমস্যা হচ্ছে। আজ তারা ঘরের পেছনের মাটি সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ঘরের মাটি আমাদের টানতে খুব কষ্ট হচ্ছে। গরীব মানুষ আমরা, কিষাণ (দিনমজুর) দিয়ে মাটি টানাবো সেই অবস্থাও নেই। আমার স্বামী অসুস্থ, কী করব? আজ চার-পাঁচ দিন কষ্ট করে মাটি টানছি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর আওতায় ২০২১ সালের ২৩ জানুয়ারি ও ২০ জুন এবং ২২ সালে তিনটি ধাপে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর, খর্নিয়া এবং কাঠালতলা এলাকায় শতাধিক ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন করে তৎকালীন সরকার। চুকনগর, খর্নিয়া এবং কাঁঠালতলা এলাকায় খাস জমি চিহ্নিত করে দুই কক্ষবিশিষ্ট সেমি-পাকা ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়। জমিসহ ঘরের দলিল হস্তান্তরের দিন এই মানুষগুলোর চোখে ছিল আনন্দের জল। যারা একসময় রেললাইনের ধারে বা অন্যের বারান্দায় রাত কাটাতেন, তারা পেয়েছিলেন একটি স্থায়ী ঠিকানা।

যশোর ও খুলনার ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে আপার ভদ্রাসহ ৫টি নদীর (হরিহর, হরি-তেলিগাতী, আপারভদ্রা, টেকা ও শ্রী) ৮১.৫ কিলোমিটার পুনঃখনন কাজ দেয় সরকার। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে নদী খননের এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড মাধ্যমে বাস্তবায়িত হওয়ায় এই নদী খনন শুরু হয়।

ডুমুরিয়ার আটলিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বেলাল হোসেন বলেন, বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১২৫টি ঘর রয়েছে। এরমধ্যে ১০টি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেঙে যাওয়া ১০টি ঘর মেরামতে করে দেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসন এবং উপজেলা প্রশাসন সহযোগিতা করছে। গতকাল এবং আজ দুইদিনে অধিকাংশ মাটি অপসারণ করা হয়েছে। প্রত্যেকটা ঘর শঙ্কামুক্ত হয়ে গেছে।

ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবিতা সরকার বলেন, ডুমুরিয়ার বরাতিয়ার কাঠালতলা ও খর্নিয়ার গৃহহীন পরিবারের ঘরগুলোতে নদী খননের মাটি উঠে গেছে এই ঘটনা সত্য। এই নদী খনন প্রকল্প যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সোনাবাহিনীর তত্ত্বাবধায়নে পরিচালিত হচ্ছে। আমি ইতোমধ্যে যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে কথা বলেছি। তারা বিষয়টি অবগত। খুব তাড়াতাড়ি ভূমিহীন এসব পরিবারের জন্য তারা ব্যবস্থা নেবেন। এছাড়া চুকনগরের যে পরিবারগুলো ছিল, তারা ওই পাশের হাটের জায়গায় বসবাস করছে। কিছুদিন আগে কয়েকটি পরিবারকে অন্য আশ্রয়ণ প্রকল্পে সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হলেও তারা সেখানে যাননি। বিষয়টি জেলা প্রশাসক স্যারকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।

এদিকে গত ১৪ জুন বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত নিউজ সংশ্লিষ্টদের নজরে এলে আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘরের পেছেন দিক থেকে মাটি অপসারণের কাজ শুরু হয়। গতকাল মঙ্গলবার (১৬ জুন) ক্ষতিগ্রস্ত বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্প পরিদর্শন করেছেন খুলনা জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

এ সময় জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত সাংবাদিকদের বলেন, ‘যশোর-ভবদহ ও খুলনা অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে ভদ্রাসহ কয়েকটি নদী খননের কাজ চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এ কাজ বাস্তবায়ন করছে। সরকার সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করে। সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কিছু সুফলভোগীর ক্ষতি হয়েছে। সেটা দেখার জন্য সরেজমিনে আসা হয়েছে। এখানে যাদের ক্ষতি হয়েছে, সেগুলো পুষিয়ে দেওয়া হবে।’

সূত্র: ঢাকা পোস্ট

আপনার মতামত দিন

Divider Icon
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...
শিরোনাম
এক ম্যাচেই রেকর্ডবুকে ঝড় তুলেছেন ফুটবল জাদুকর মেসি মেসির হ্যাটট্রিকে ৩-০ গোলে আলজেরিয়াকে উড়ালো আর্জেন্টিনা নদী খননের মাটিতে চাপা পড়েছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর, দিশেহারা গৃহহীনরা চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে সবুজ অবকাঠামো নিশ্চিতের নির্দেশ ২৮ জুন দেশব্যাপী ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন বাংলাদেশের বিমান খাতে কাজ করতে আগ্রহী সুইজারল্যান্ড যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের বিশেষ অভিযান, নারীসহ গ্রেফতার ৪৬ পুলিশের পৃথক অভিযানে রাজশাহীতে গ্রেপ্তার ১৬ ডেঙ্গুতে আরও একজনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১১৩ যুক্তরাষ্ট্রে গেলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ এক ম্যাচেই রেকর্ডবুকে ঝড় তুলেছেন ফুটবল জাদুকর মেসি মেসির হ্যাটট্রিকে ৩-০ গোলে আলজেরিয়াকে উড়ালো আর্জেন্টিনা নদী খননের মাটিতে চাপা পড়েছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর, দিশেহারা গৃহহীনরা চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে সবুজ অবকাঠামো নিশ্চিতের নির্দেশ ২৮ জুন দেশব্যাপী ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন বাংলাদেশের বিমান খাতে কাজ করতে আগ্রহী সুইজারল্যান্ড যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের বিশেষ অভিযান, নারীসহ গ্রেফতার ৪৬ পুলিশের পৃথক অভিযানে রাজশাহীতে গ্রেপ্তার ১৬ ডেঙ্গুতে আরও একজনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১১৩ যুক্তরাষ্ট্রে গেলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ