পানি বৃদ্ধির ফলে তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে নদীর পানি এখন বিপদসীমার একেবারে কাছাকাছি অবস্থান করছে। টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর পানি হু হু করে বাড়ছে। বর্তমানে পানি বিপদসীমার ১৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী।
পানি বাড়তে থাকায় নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও চর এলাকায় পানি প্রবেশ করেছে। এতে অনেক নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। রংপুর বিভাগের লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার তিস্তাপাড়ে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নদীপাড়ের বাসিন্দাদের পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ডও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সকাল ৯টায় লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার দোয়ানী তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে নদীর পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ৫২ দশমিক ০২ মিটার। এ পয়েন্টে বিপদসীমা ৫২ দশমিক ১৫ মিটার। আগের দিন শুক্রবার সকাল ৯টায় পানির উচ্চতা ছিল ৫১ দশমিক ৬৪ মিটার।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী। তিনি বলেন, ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের ২০টি গেট খুলে দেওয়ায় তিস্তার পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে। এরই মধ্যে অনেক কৃষকের আবাদি জমি পানিতে ডুবে গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, তিস্তার পানি এখনও বিপদসীমার নিচে থাকলেও আগামীকাল (রোববার) সকালের মধ্যে তা বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে নদীর দুই তীর উপচে চরাঞ্চলের আরও বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে আবাদি জমি তলিয়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চরাঞ্চলের কৃষকরা।
হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী এলাকার কৃষক শামসুল হক বলেন, শনিবার ভোরেই তাদের এলাকায় তিস্তার পানি ঢুকে পড়েছে। পানি আর কিছুটা বাড়লে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। নদীর পানি যেভাবে বাড়ছে, তাতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ভোগ দেখা দিতে পারে।
কালীগঞ্জ উপজেলার চর শৌলমারী এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম জানান, তাদের পুরো চর ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে। আপাতত তারা বাড়িতে অবস্থান করলেও পানি আরও বাড়লে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে। তিনি বলেন, কয়েক দিন ধরে রাতে বৃষ্টির পাশাপাশি উজান থেকে প্রচুর পাহাড়ি ঢল নেমে আসছে।
মহিপুর তিস্তার চর এলাকার কৃষক মকবুল হোসেন বলেন, উজানের পানির প্রবাহ দেখে মনে হচ্ছে এবার বড় ধরনের বন্যা হতে পারে। খেতে তেমন ফসল না থাকলেও আমন ধানের চারা তৈরির জন্য প্রস্তুত করা বীজতলা পানিতে তলিয়ে গেছে।
চর রাজপুরের কৃষক সুলাইমান আলী বলেন, চরে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির আবাদ করা হয়েছিল। হঠাৎ পানি বেড়ে যাওয়ায় সেগুলো তলিয়ে গেছে, ফলে তারা চরম বিপাকে পড়েছেন।
চর ইসলি এলাকার কৃষক আমজাদ আলী জানান, তার দেড় বিঘা জমিতে আবাদ করা বাদামের ক্ষেত পানিতে ডুবে গেছে। পানি দীর্ঘস্থায়ী হলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার জানান, বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে গত ২৪ ঘণ্টায় তিস্তার পানি ৩৮ সেন্টিমিটার বেড়েছে। শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত পানি বিপদসীমার মাত্র ১৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
তিনি বলেন, ‘যেকোনো সময় পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে তিস্তাপাড়ে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। উজান থেকে পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় পানির উচ্চতা আরও বাড়তে পারে। আমরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।’
রংপুর বিভাগীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব বলেন, নদ-নদীর পানির উচ্চতা বৃদ্ধি ও নদীতীরবর্তী ভাঙন পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার, ধরলা, গঙ্গাধর, জিঞ্জিরাম ও ঘাঘট নদীতে আপাতত বন্যা পরিস্থিতি না থাকলেও তিস্তাপাড়ে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।