বরিশালের জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আগৈলঝাড়া উপজেলায় মাদক বিরোধী অভিযানের নামে নিরীহ মানুষকে হয়রানি, অর্থ আদায় ও মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
রোববার (১১ আগস্ট) বরিশাল প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এসব অভিযোগ তোলেন আগৈলঝাড়া উপজেলার রত্নপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো: জাফর হাওলাদার ও একই এলাকার বাসিন্দা বাদশা হাওলাদার।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জাফর হাওলাদার অভিযোগ করেন, জেলা ডিবি পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা উপজেলার মোল্লাপাড়া গ্রামে প্রায়ই সাদা পোশাকে নাটকীয় অভিযান চালায়। তারা এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী নয়ন ঢালী এবং গৈলা ইউপির ভদ্রপাড়ার সাহিন সরদারকে সোর্স হিসেবে ব্যবহার করে গ্রামের স্বচ্ছল পরিবারের উঠতি বয়সী কিশোর-তরুনদের প্রথমে আটক করে। পরে মাদক দিয়ে মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে পরিবারের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়। যেসব পরিবার দাবি করা টাকা না দিতে পারে বা প্রতিবাদ করে তাদের সাজানো মামলায় চালান দেওয়া হয়।
তিনি লিখিত বক্তব্যে আরও জানান, গত ১১ আগস্ট রাত সাড়ে ৯ টার দিকে তার ছেলে নাদিম, প্রতিবেশি বাদশা হাওলাদারের ছেলে শিক্ষার্থী সাব্বির ও শহিদুল হাওলাদারের ছেলে শিক্ষার্থী সোহাগকে বাড়ির সামনে থেকে বিনা অপরাধে আটক করে জেলা ডিবির এএসআই রাজিব চন্দ্র পাল, এসআই আবজাল হোসাইনসহ ৫/৭ জন এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা। এ সময় সেখানে সোর্স নয়ন ঢালী ও সাহিন উপস্থিত ছিলো। খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছে কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই নাদিম, সাব্বির ও সোহাগকে নিয়ে চলে যায় ডিবি পুলিশের সদস্যরা। এ ঘটনার পরে গভীর রাতে প্রতিবেশি সাব্বির ও সোহাগের পরিবারের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে পূর্বে ডিবির হয়রানির প্রতিবাদ করায় ক্ষোভ থেকে তার ছেলে নাদিমকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। গৌরনদী থানার একটি মামলায় ১০১ পিস ইয়াবাসহ তাকে আটকের ভুয়া এজাহার তৈরি করে, যার সাথে বাস্তবতার কোনো মিল নেই বলে দাবি করেন তিনি।
বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, মামলার এজাহারে ডিবি পুলিশের এসআই আবজাল উল্লেখ করেন তার ছেলে নাদিমের কাছ থেকে ১০১ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে এবং ঘটনাস্থল দেখানো হয়েছে গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া বাজার সংলগ্ন ছয়গ্রামগামী রাস্তার মুখ। যা সম্পূর্ন মিথ্যা এবং বানোয়াট। এছাড়া এজাহারে যাদের সাক্ষী করা হয়েছে তারা এই ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানেন না।
লিখিত বক্তব্যে ভুক্তভোগী বিএনপি নেতা জাফর হাওলাদার বলেন, কিছুদিন আগে রত্নপুর ইউনিয়নের বরিয়াল বারহাজার গ্রামের কাওসার নামের একজন মাছ চাষী ও খামার ব্যবসায়ীর মুরগির খামারে সাদা পোশাকে অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্য। তারা কাওসারের মুরগীর খামারে কোনো মাদকদ্রব্য না পেলেও মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়। কযেকদিন পরে একই মুরগির খামারে অভিযানে যায় জেলা ডিবি পুলিশের সদস্যরা এবং তারাও একইভাবে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়। এমনকি সেখান থেকে একটি মোবাইল ফোনও লুটে নেয়। এই দুই সংস্থার অভিযানের সময় সোর্স নয়ন ও শাহিন উপস্থিত ছিলো। ভুক্তভোগী কাওসার ভয়ে মুখ খুলতে পারছে না।
বিএনপি নেতা জাফর হাওলাদার অভিযোগ করে বলেন, ইতিপূর্বে তাদের এলাকায় জেলা ডিবি পুলিশের এএসআই রাজিব চন্দ্র পাল ও মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের সদস্যরা একাধিক ধরপাকড় বাণিজ্যের ঘটনা ঘটায়। যা নিয়ে প্রতিবাদ করায় পুলিশের ওই কর্মকর্তারা আগে থেকেই তাকে হুমকির মুখে রেখেছিলেন। ভুক্তভোগী হিসেবে তিনি এ বিষয়ে উর্ধ্বতন পুলিশ প্রশাসন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। একই সাথে নাটকীয় ও মিথ্যা মামলা থেকে তার ছেলে নাদিমের নাম প্রত্যাহার এবং অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে আরেক ভুক্তভোগী কলেজ শিক্ষার্থী সাব্বিবের বাবা বাদশা হাওলাদার বলেন, তার ছেলে ও প্রতিবেশী সোহাগকে আটক করার পরে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে আনা হয়। তিনি এসব অসাধু কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকা ডিবি পুলিশের করা ভূয়া মামলার ১ নম্বর সাক্ষী লালমিয়া হাওলাদার বলেন ঘটনা সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না। অথচ কিভাবে তাকে সাক্ষী দেওয়া হয়েছে সেটিও তার অজানা।
এদিকে সংবাদ সম্মেলনের শেষের দিকে উপস্থিত হয়ে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের এএসআই রাজিবের সোর্স মাদক বিক্রতা নয়ন ঢালী বলেন, গত ১১ আগস্ট রাতের ঘটনায় তিনি উপস্থিত ছিলেন। তার সামনেই পুরো ঘটনা ঘটেছে। ওই রাতে আটককৃত নাদিম, সাব্বির ও সোহাগের কাছে কোনো মাদক পাওয়া যায়নি। নাদিমকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।
অপরদিকে অভিযুক্ত জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপ-পরিদশক (এসআই) আবজাল হোসাইনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সংবাদকর্মীর পরিচয় পেয়ে তিনি ব্যস্ত রয়েছেন জানিয়ে ফোনটি কেটে দেন।