চার বছরের শিশু রাকিবা আক্তার রুহিকে হত্যার পর মাটিচাপা দেওয়ার ঘটনায় তার মা, মায়ের কথিত প্রেমিকসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) ভোরে শিশুটির গলিত মরদেহের কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়।
মঙ্গলবার দুপুরে দিনাজপুর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) আনোয়ার হোসেন। এ সময় সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল হালিম, জেলা গোয়েন্দা শাখার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলমগীর ও কোতয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মনিরুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন- সদর উপজেলার নশিপুর খোসালপুর গ্রামের জমসেদ আলীর মেয়ে ও নিহত রুহির মা মোছা. জিন্নাতুন (১৯), তার কথিত প্রেমিক একই এলাকার মৃত নেপাল টুডুর ছেলে রিপন টুডু (৩৫) এবং রিপনের আত্মীয় সুজন টুডু (২০)। মঙ্গলবার বিকেলে গ্রেপ্তার তিনজনকে আদালতে পাঠানো হলে বিচারক তাদের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
পুলিশ জানায়, জিন্নাতুনের আগে অন্যত্র বিয়ে হয়েছিল। পরে তাদের বিচ্ছেদ হয়। তার চার বছর বয়সী মেয়ে রাকিবা আক্তার রুহি ছিল। প্রায় ছয় মাস আগে রিপন টুডুর সঙ্গে জিন্নাতুনের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৫ জুন রাতে রিপন টুডু শিশু রুহির ওপর নির্যাতন শুরু করেন। এ সময় তার মা জিন্নাতুন কাপড় দিয়ে শিশুটির মুখ চেপে ধরেন, যাতে সে চিৎকার করতে না পারে। একপর্যায়ে শ্বাসরোধ হয়ে শিশুটির মৃত্যু হয়। পরে ঘটনা সামাল দিতে রিপন তার আত্মীয় সুজন টুডুকে ডেকে আনেন। তারা বাড়ির পাশে প্রায় ছয় ফুট গভীর গর্ত করে বস্তায় ভরে শিশুটির মরদেহ মাটিচাপা দেন।
পুলিশ আরো জানায়, ঘটনার বিষয়টি নিয়ে এলাকায় কানাঘুষা শুরু হলে ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে সম্প্রতি ওই গর্তের পাশে একটি কুকুর হত্যা করে পুঁতে রাখা হয়।
দুর্গন্ধ বের হলে যাতে মানুষ সেখানে কুকুরের মরদেহ থাকার বিষয়টি মনে করে, সে উদ্দেশেই এমনটি করা হয়েছিল বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন বলেন, গত ২১ সেপ্টেম্বর নিহত শিশুর নানা জমসেদ আলী বাদী হয়ে থানায় এজাহার দায়ের করেন। এরপর ডিবি ও কোতয়ালী থানা পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে।
তিনি বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের নিয়ে সোমবার রাতে ঘটনাস্থলে গিয়ে বিভিন্ন জায়গায় মাটি খোঁড়া হয়। রাত ১২টার দিকে একটি গর্ত থেকে কুকুরের মরদেহ উদ্ধার হয়। পরে অভিযান স্থগিত করে পুলিশ ফিরে আসে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আরো জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মঙ্গলবার ভোরে আবারও অভিযান চালানো হয়। এ সময় তারা কুকুরের মরদেহ উদ্ধারের স্থানের পাশে আরেকটি জায়গা দেখিয়ে দেয়। সেখানে প্রায় ছয় ফুট মাটি খুঁড়ে একটি বস্তার ভেতর থেকে শিশুটির কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের দাবি, জিন্নাতুন ও রিপন একসঙ্গে থাকা শুরু করার পর থেকেই তারা বিভিন্ন সময় শিশু রুহির ওপর নির্যাতন চালাতেন।
এদিকে, ঘটনা এলাকায় জানাজানি হলে গত রবিবার স্থানীয়রা রিপন টুডুর বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেন। পরে তাঁর মোটরসাইকেল ও বাড়ির আসবাবপত্র বের করে দিনাজপুর-দশমাইল মহাসড়কের জামতলী বাজারে সড়কের ওপর রেখে আগুন ধরিয়ে দেন স্থানীয়রা। এ সময় মহাসড়ক অবরোধ করা হয়। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর স্থানীয় সংসদ সদস্য সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম ও পুলিশের আশ্বাসে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়। এরপর পুলিশ অভিযান জোরদার করে তিনজনকে গ্রেপ্তার ও শিশুটির মরদেহ উদ্ধারে সক্ষম হয়।