আমেরিকার মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে পরাস্ত করা। কিন্তু তেহরানের ভূ-রাজনৈতিক চাল ওয়াশিংটনকে এনে দাঁড় করিয়েছে এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের মুখে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউজউইকের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, পরমাণু বোমার চেয়েও শক্তিশালী এক হাতিয়ার হিসেবে হরমুজ প্রণালিকে ব্যবহার করছে ইরান।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক জলপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে তেহরান বৈশ্বিক বাণিজ্যে স্থবিরতা তৈরি করছে। এতে আমেরিকার সামরিক শক্তি ও অর্থনীতিও পরোক্ষা ও প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
হরমুজে অচলাবস্থার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দামে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। জাহাজ চলাচলের খরচ ও বিমা মাশুল আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। এর ফলে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দা আমেরিকায় সাধারণ মানুষের অসন্তোষ বাড়িয়ে তুলছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হামলার হুমকি দিলেও শেষ পর্যন্ত বাস্তবে তা প্রয়োগ করা থেকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন। আর এতেই আমেরিকান নীতি নির্ধারণের জটিলতাকে স্পষ্ট করে তোলে।
গত ছয় মাস ধরে চলা এই উত্তেজনার শুরুতে মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের অভিযোগ। তেহরান সবসময়ই তাদের এই কর্মসূচিকে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ বলে দাবি করে আসলেও যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সংঘাতের গতিপথ পারমাণবিক বিতর্ক থেকে সরে গিয়ে এখন আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ হরমুজ প্রনালী এবং জ্বালানি নিরাপত্তায় এসে ঠেকেছে।
সাবেক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা ও ডিরেক্টর জশুয়া টালিস নিউজউইককে জানান, ইরানের স্বল্পমূল্যের ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্রের বিপরীতে আমেরিকাকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রক্ষেপক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে মার্কিন যুদ্ধাস্ত্রের ভাণ্ডার দ্রুত খালি হচ্ছে। এই দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত ওয়াশিংটনকে চরম সামরিক ও কৌশলগত চাপে ফেলে দিয়েছে।
ইরানের এই কৌশলের সাথে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। লোহিত সাগরে হুথির ক্রমাগত হামলার কারণে বিশ্ব বাণিজ্যের বড় অংশ সুয়েজ খাল ত্যাগ করে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ দিয়ে ঘুরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে পণ্য পরিবহনে বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক সমঝোতা চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার পর সংকট আরও গভীর হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত বা ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের ক্ষেত্রে সময় যে আমেরিকার পক্ষে কাজ করবে না, বিশ্লেষকদের মতে সেটাই এখন স্পষ্ট। ওয়াশিংটনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সংঘাত শুরু করা নয় বরং তা বজায় রাখা।