বরিশালের গৌরনদী সার্কেলের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) কতিপয় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মাদক বিরোধী অভিযানের নামে বসতঘর থেকে অসুস্থ রোগীর চিকিৎসার টাকা চুরির অভিযোগ উঠেছে। এমনকি ওই বসতঘরে তল্লাশি চালিয়ে কোনো মাদক উদ্ধার না হওয়ায় এলাকাবাসীর তোপের মুখে দীর্ঘ সময় সেখানে অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিলেন ওই কর্মকর্তারা।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকাল পৌনে ৮টার দিকে জেলার উজিরপুর উপজেলার প্রত্যন্ত বিলাঞ্চল জল্লা ইউপির সীমান্তবর্তী ওড়াবাশবাড়ি গ্রামের কামরুজ্জামান কালুর বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী কামরুজ্জামান কালু বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী।
কালু ও তার পরিবারের ভাষ্য, বসতঘরে তল্লাশির সময় সাদা পোশাকধারী ওই কর্মকর্তারা বিছানায় থাকা বালিশের নিজ থেকে চিকিৎসার জন্য রাখা ১৫ হাজার টাকা নিয়ে যায়। এর আগেও কালুকে মিথ্যা মাদক মামলায় ফাঁসানো ভয়ভীতি দেখিয়ে গত এক মাসে ২ দফায় এক লাখ ১০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ৮টার দিকে উপজেলার জল্লা ইউপির ওড়াবাশবাড়ি গ্রামের কামরুজ্জামান কালুর বসতঘর থেকে মাদক উদ্ধারের অভিযানে যায় সাদা পোশাকধারী ৫ জনের একটি দল। প্রথমে পরিচয় না দিলেও পরবর্তীতে স্থানীয় তোপের মুখে নিজেদেরকে গৌরনদী সার্কেলের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্য পরিচয় দেন। পরে স্থানীয়দের উপস্থিতিতে কালুর বসতঘরে তল্লাশি চালায় ডিএনসির গৌরনদী সার্কেলের উপ-পরিদর্শক ফাইজুল ইসলাম ও তার নেতৃত্বাধীন টিমের সদস্য রুবেল হোসেন, ফয়সাল হোসেনসহ আরও কয়েকজন। তবে অভিযানে কালুর বসতঘর থেকে কোনো ধরনের মাদকদ্রব্য উদ্ধার করতে পারেননি ডিএনসি কর্মকর্তারা। স্থানীয়দের দাবি, কালু অনেক বছর আগে মাদক সেবন করতেন। দীর্ঘ ৫ থেকে ৬ বছর আগে মাদক সেবন ছেড়ে দিয়ে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন।
অভিযান পরিচালনার বিষয়টি নিশ্চিত করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) গৌরনদী সার্কেলের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. ফাইজুল ইসলাম হাওলাদার মুঠোফোনে জানান, কামরুজ্জামান কালুর বসতঘর তল্লাশি চালিয়ে কোনো মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়নি। আমরা সেখানে একটি নিষ্ফল অভিযান করেছি। বসতঘর তল্লাশির সময় টাকা চুরি এবং এর আগেও দুই দফায় লক্ষাধিক টাকা হাতানোর বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করে ডিএনসির এই কর্মকর্তা বলেন, এগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট।
ভুক্তভোগী কামরুজ্জামান কালুর স্ত্রী সুখী বেগম অভিযোগ করে বলেন, সকালে ৮টার আগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ফাইজুল ইসলাম ও হৃদয়সহ চার থেকে পাঁচজন লোক তাদের বাড়িতে আসে। প্রথমে তারা সুখী বেগমকে ডেকে নিয়ে তার অসুস্থ স্বামীকে মাদক দিয়ে মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। এ সময় তারা বলেন “কালু ভালো হয়ে গেছে তাতে কি হয়েছে, ডোপ টেস্ট করলে যত বছর আগেই মাদক সেবন করছে তা বের হয়ে যাবে; এরপর ওরে মামলায় দিবো”।
সুখী বেগম আরও বলেন, দাবিকৃত টাকা দিতে রাজি না হলে অভিযানে আসা কর্মকর্তারা তিনিসহ তার মেয়ের সাথে খুব খারাপ আচরন করেন এবং বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধামকি দেয়। যা দেখে আশপাশের লোকজন বাড়িতে জড়ো হতে থাকে। এরপরেই ফাইজুল ইসলাম বলেন ঘরে তল্লাশি চালাবেন। একপর্যায়ে আশপাশের লোকজন গ্রাম পুলিশ নাজির হোসেনকে ফোন দিয়ে ঘটনাস্থলে আনেন। পরে বসতঘরে তল্লাশি চালানো হয়, কিন্তু অবৈধ কিছুই তারা উদ্ধার করতে পারেনি।
সুখী বেগম ক্ষুব্ধ কন্ঠে বলেন, তার স্বামী কোনো মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত নয়। তারপরেও মাদকের অভিযানের নামে ডিএনসির সদস্যরা বসতঘর তল্লাশির ফাঁকে বালিশের নিচ থেকে ১৫ হাজার টাকা নিয়ে যায়। ওই টাকা তার শয্যাশায়ী স্বামীর চিকিৎসার জন্য রাখা ছিলো। তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে অভিযুক্তদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
ঘটনার বিষয়ে জানতে প্রত্যক্ষদর্শী গ্রাম পুলিশ নাজির হোসেনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কালুর বাড়িতে সাদা পোশাকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এসেছিলেন। পরে স্থানীয়রা ফোন করলে আমি সেখানে যাই, তবে কালুর ঘর থেকে কোনো মাদক উদ্ধার হয়নি।
এসব বিষয়ে জানতে বরিশাল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. তানভীর হোসেন খানের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, গৌরনদী সার্কেল থেকে সকালে একটি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে তবে সেটি উজিরপুরে কিনা তার জানা নেই।
অভিযান পরিচালনায় গিয়ে বসতঘর থেকে টাকা চুরি ও মাদক মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে দুই দফায় লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ডিএনসির এই উপপরিচালক বলেন, আমি খোঁজখবর নিয়ে আপনার সাথে রাতে কথা বলবো। যদি কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ধরনের কোনো অভিযোগ থাকে অবশ্যই তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরিশাল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিদর্শক (এসআই) ফাইজুল ইসলাম হাওলাদার দীর্ঘ সাত বছর ধরে গৌরনদী সার্কেলের দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, এসআই ফাইজুল ইসলাম একই স্টেশনে দীর্ঘদিন থাকার কারণে বিভিন্ন ধরনের অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছেন। তিনিসহ তার নেতৃত্বাধীন টিম প্রায়ই সাদা পোশাকে আগৈলঝাড়া ও উজিরপুরের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে মাদক বিরোধী অভিযানের নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানির মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।