ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে লিবিয়ার তবরুক থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে দিকভ্রষ্ট হওয়া একটি রাবারের নৌকা থেকে ২৯ বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা হয়েছে। মিসরের মারসা মাতরুহ উপকূল থেকে উদ্ধারের পর তাঁদের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
নৌকাটিতে থাকা ৪২ জনের মধ্যে ৯ বাংলাদেশি ও একজন সুদানি নাগরিকসহ ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল কায়রোর বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রাথমিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।
অন্যদিকে, একই নৌকায় থাকা সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার অন্তত সাত যুবক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে পরিবার ও পুলিশ।
দূতাবাসের প্রতিবেদনে বলা হয়, মানব পাচার চক্রের সহায়তায় লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ৩ আগস্ট ৩৮ বাংলাদেশি ও চার সুদানি নাগরিকসহ ৪২ জন তবরুক থেকে রাবারের নৌকায় যাত্রা করেন।
স্পিডবোটের ইঞ্জিনে চালিত নৌকাটিতে কোনো উপযুক্ত নেভিগেশন ব্যবস্থা ছিল না। যাত্রীদের বলা হয়েছিল, গ্রিসে পৌঁছাতে প্রায় ৩৬ ঘণ্টা সময় লাগবে। কিন্তু নেভিগেশন ব্যবস্থা না থাকায় একপর্যায়ে নৌকাটি দিকভ্রষ্ট হয়ে পড়ে। পরে জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে সেটি সাগরে ভাসতে থাকে। প্রায় ১০ দিন সাগরে ভেসে থাকার পর ১৩ আগস্ট নৌকাটি মিসরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছায়। স্থানীয় পুলিশ তখন যাত্রীদের উদ্ধার করে। উদ্ধার করা ব্যক্তিদের মধ্যে ১৮ জন গুরুতর অসুস্থ ও অচেতন ছিলেন। তাঁদের মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, বর্তমানে ২৯ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বাংলাদেশি নাগরিক আবদুল করিমের সঙ্গে কথা বলে নৌযাত্রার বিস্তারিত তথ্য জানতে পারেন দূতাবাসের কর্মকর্তারা। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তীব্র গরম, প্রচণ্ড রোদ, খাদ্য ও পানির সংকটে ৯ বাংলাদেশি ও একজন সুদানি নাগরিক মারা যান। দীর্ঘ সময় সাগরে ভেসে থাকায় মৃতদেহগুলোতে পচন ধরেছিল। একপর্যায়ে জীবিত যাত্রীরা বাধ্য হয়ে সেগুলো সমুদ্রে ভাসিয়ে দেন।
ঘটনার পর থেকে মিসরে বাংলাদেশ দূতাবাস স্থানীয় পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। চিকিৎসাধীন বাংলাদেশিদের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। দূতাবাস জানিয়েছে, তাঁরা সুস্থ হয়ে উঠলে মিসরের আইন ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।
এদিকে একই নৌকায় থাকা সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার অন্তত সাত যুবক নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁরা হলেন-পাগলা শত্রুমর্দন গ্রামের হৃদয় পাল, চিকারকান্দি গ্রামের এনামুল খান, রিপন মিয়া ও মামুন খান, রনসী গ্রামের মোহাম্মদ তালহা ও ছাব্বির এবং ডুংরিয়া গ্রামের সোহেল। তাঁদের নিখোঁজ হওয়ার খবরে পরিবারগুলোতে চলছে শোকের মাতম।
নিখোঁজ হৃদয় পালের চাচা কানন পাল বলেন, ‘৩১ জুলাই ভাতিজার সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয়েছিল। সে জানিয়েছিল, ৩ আগস্ট যাত্রা করবে। পরে জানতে পারি, ওই দিন লিবিয়া থেকে দুটি নৌকায় করে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা গ্রিসের উদ্দেশ্যে রওনা হন। প্রথম নৌকা থেকে জানানো হয়, আমার ভাতিজা দ্বিতীয় নৌকায় রয়েছে। এরপর আর তার কোনো খোঁজ পাইনি।’
তিনি বলেন, পরে উপজেলার এক যুবকের ভিডিও বার্তায় জানতে পারেন, নৌকাটির ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেটি প্রায় ১০ দিন সাগরে ভেসে ছিল। এ সময় অনাহারে অনেকের মৃত্যু হয়।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকার সাত যুবক নিখোঁজের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি জানতে পেরেছি।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন