অবশেষে হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিয়েছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’। প্রায় চার মাস আটকে থাকার পর বাংলাদেশ সময় সোমবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে জাহাজটি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, বাংলার জয়যাত্রা ৩টায় হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিয়েছে। জাহাজটি বর্তমানে বাংকারিং (জ্বালানি) নেওয়ার জন্য ফুজাইরা বন্দরের দিকে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
বিএসসির তথ্য অনুযায়ী, এমভি বাংলার জয়যাত্রা গত ২ ফেব্রুয়ারি হরমুজ প্রণালি হয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করেছিল। পরে এটি কাতারের একটি বন্দর থেকে স্টিল কয়েল বোঝাই করে ২৭ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাবেল আলী বন্দরে পৌঁছায়।
পরের দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হয়। এরমধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেয় ইরান। গত ১১ মার্চ জাবেল আলীতে পণ্য খালাসের পর জাহাজটি পরবর্তী ভয়েজের জন্য কুয়েতে যাওয়ার কথা ছিল। তবে নিরাপত্তার ঝুঁকি বিবেচনায় বিএসসি জাহাজটিকে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
গত ৩ মার্চ দক্ষিণ আফ্রিকার কেউটাউনে যাওয়ার জন্য সৌদি আরবের রাস আল খায়ের বন্দর থেকে ৩৭ হাজার টন সার বোঝাই করে এমভি বাংলার জয়যাত্রা। কিন্তু হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় জাহাজটি রাস আল খায়ের বন্দরে আটকে পড়ে। পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হলে গত ৮ এপ্রিল জাহাজটি কেপটাউনের উদ্দেশে রাস আল খায়ের ত্যাগ করে। ১০ এপ্রিল হরমুজ পাড়ি দিতে গিয়ে ইরানি কর্তৃপক্ষের বাধার মুখে পড়ে বাংলার জয়যাত্রা।
পরে জাহাজটি মিনা সাকার বন্দরের অ্যাংকরে নোঙর করে। সর্বশেষ ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা চুক্তি হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকারের দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় জাহাজটি মঙ্গলবার রাতে হরমুজ প্রণালি পারি দিতে সমর্থ হয়।
২০১৮ সালে নির্মিত ৩৮ হাজার ৮৯৪ টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই বাল্ক ক্যারিয়ার এমভি বাংলার জয়যাত্রা জাহাজে কর্মরত ৩১ জন ক্রুর সবাই বাংলাদেশি নাগরিক, যারা সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সুস্থ আছেন বলে জানিয়েছেন বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক।
তিনি বলেন, সীমাহীন সাহসিকতা, সুনিপুণ নৌ-কৌশল এবং সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সার্বক্ষণিক দিকনির্দেশনায় ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ এক চরম সংকটময় পরিস্থিতি সফলভাবে মোকাবিলা করেছে।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের এই স্পর্শকাতর যুদ্ধক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে আটকা পড়ে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। বিশ্ব মেরিটাইম খাতে বাংলাদেশের জন্য এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কমোডর মালেক বলেন, দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ থাকার সংকটের পুরো সময়ে জাহাজের ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক ও ক্রুদের মনোবল সমুন্নত রাখতে বিএসসির পক্ষ থেকে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। জাহাজে সুপেয় পানি, খাবার, রসদ ও জ্বালানি তেলের মতো প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস সরবরাহে কখনোই কোনো ঘাটতি হয়নি। পাশাপাশি নাবিকদের শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখতে স্বাভাবিক সুযোগ-সুবিধার অতিরিক্ত হিসেবে দৈনিক ৫ মার্কিন ডলার বিশেষ মিল অ্যালাউন্স, ঈদের বিশেষ প্রণোদনা এবং ‘ওয়ার ওয়েজ’ দেওয়া হয়েছে।