ইরানের সঙ্গে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ঠিক কতখানি ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে, পেন্টাগনের এক গোপন প্রতিবেদনে তার এক চাঞ্চল্যকর চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। ইরানের লাগাতার হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে থাকা শত শত অবকাঠামো ধূলিসাৎ হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যতই বলুন না কেন যে তাদের অস্ত্রভাণ্ডার অফুরন্ত, পেন্টাগনের এই প্রতিবেদনে বরং অস্ত্র ঘাটতি এবং সাপ্লাই চেইনে বড় ধরনের সংকটের কথা স্বীকার করা হয়েছে।
এতদিন ওয়াশিংটন সবকিছু আড়াল করার চেষ্টা করলেও, প্রতিরক্ষা বিভাগের ইন্সপেক্টরের সাধারণ কার্যালয়ের এই নথিতে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন শক্তির বড় ধরনের বিপর্যয়ের তথ্য সামনে এসেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি থেকে চলা যুদ্ধে অন্তত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ৮০০ সেনা গুরুতর আহত হয়েছেন। ধ্বংস হয়েছে কমপক্ষে ৫০টিরও বেশি যুদ্ধবিমান। যার মধ্যে রয়েছে- ৩০টিরও বেশি সর্বাধুনিক এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন, এফ-১৫ই ফাইটার জেট, অত্যাধুনিক এফ-৩৫এ স্টিলথ বিমান, রিফুয়েলিং ট্যাংকার, এমকিউ-৪সি সামুদ্রিক ড্রোন এবং বিভিন্ন ধরনের হেলিকপ্টার।
প্রতিবেদন বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রথম চার মাসেই শুধু অস্ত্র পেছনে খরচ হয়েছে প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার, আর মোট ব্যয় ছাড়িয়ে গেছে ৩৩ বিলিয়ন ডলার।
সিএনএনের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ইরানের পাল্টা হামলায় কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান এবং জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর শত শত ভবন ও স্থাপনা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।
সিএনএনের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আমেরিকার টিএইচএএডি (থাড) ইন্টারসেপ্টরের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের প্রায় অর্ধেক অংশই ব্যবহৃত হয়ে গেছে। শীর্ষ মার্কিন সামরিক কমান্ডাররা ইতোমধ্যে সতর্ক বার্তা দিয়েছেন যে তাদের গোলাবারুদের প্রাক্কলিত মজুদ এখন বিপজ্জনকভাবে নিম্নপর্যায়ে নেমে এসেছে।
অন্যদিকে, বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর আঞ্চলিক সদর দপ্তরটি ইরানি হামলায় চরম ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হওয়ায় তারা বড় ধরনের রসদ সংকটে পড়েছে। ভারপ্রাপ্ত নৌ-সচিব হাং কাও এই ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, ইরান তাদের ঘাঁটিটিকে একেবারে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
যুদ্ধের এই চরম আঁচ কেবল সামরিক বাহিনীতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার কূটনৈতিক অবকাঠামোতেও বড় আঘাত এনেছে। ইরানি প্রতিশোধের ভয়াবহতায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে মার্কিন কূটনৈতিক উপস্থিতি অস্বাভাবিক হারে কমে গেছে। ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে প্রায় ৩৫০০ কূটনৈতিক কর্মী ও তাদের পরিবার অঞ্চল ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন।
ওয়াশিংটনের আনুমানিক হিসেব অনুযায়ী, অঞ্চলজুড়ে তাদের বিভিন্ন কূটনৈতিক স্থাপনায় প্রায় ১৮৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কূটনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির বিচারে সবচেয়ে বড় আর্থিক ধাক্কা খেয়েছে ইরাক। ৬০০টিরও বেশি আক্রমণের পর সেখানে মার্কিন স্থাপনার ক্ষতি নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১৫৭ মিলিয়ন ডলার।
এদিকে সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেন্টাগন ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা গোপনে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে কর্মী ও স্থাপনা কমানোর বিষয়ে আলোচনা করছেন, কারণ ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা তাদের সামরিক ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে। পেন্টাগনের প্রকাশিত এই বিস্ফোরক রিপোর্ট মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক দুর্বলতার চিত্র জনসমক্ষে উন্মোচন করে দিয়েছে, যা ওয়াশিংটনকে নতুন করে ভাবাতে বাধ্য করছে।