এবার বন্দর নগরী চট্টগ্রামের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’ নিয়ন্ত্রিত ট্রাফিক ব্যবস্থা। এ লক্ষ্যে ২১৭ কোটি ৩৩ লাখ টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব(ডিপিপি) প্রস্তুত করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)।
সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, নগরীর দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যা দূর করা ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এ আধুনিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এআই ট্রাফিক ব্যবস্থা চালু হলে সড়কে যেমন শৃঙ্খলা ফিরবে, তেমনি কমবে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি।
বর্তমানে ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে মূলত হাতের ইশারা ও বাঁশির মাধ্যমেই। অধিকাংশ সড়কে কার্যকর কোনো সংকেত বাতি নেই। ফলে ম্যানুয়াল বা সনাতন পদ্ধতিতে কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। পাশাপাশি রয়েছে তীব্র যানজট ও ট্রাফিক আইন অমান্যের অভিযোগ।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রামকে একটি পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ ও স্মার্ট নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে আধুনিক প্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই। এই সিস্টেমটি সম্পূর্ণ এআই-ভিত্তিক হওয়ায় কোনো যানবাহন ট্রাফিক আইন অমান্য করলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা যাবে। এর ফলে পুরো শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে চলে আসবে, যা যানজট কমিয়ে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে।
মেয়র জানান, প্রকল্পটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে পুলিশ প্রশাসন, বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট সব সেবা সংস্থার মতামত ও সুপারিশ এতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, চসিকের এই উদ্যোগের আওতায় নগরীর ৫৬টি গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেকশন(মোড়) ও ব্যস্ত ট্রাফিক জোনকে আধুনিক প্রযুক্তির আওতায় আনা হবে। এসব স্থানে স্থাপন করা হবে স্বয়ংক্রিয় স্মার্ট সিগন্যাল ব্যবস্থা ও ট্রাফিক ফ্লো মনিটরিং। আইন লঙ্ঘন শনাক্তকারী ক্যামেরা ও রেড সিগন্যাল ডিটেক্টর। স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ প্রযুক্তি। একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টার।
সিটি করপোরেশনের সম্ভাব্য প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরে মোট ১৯৬টি ইন্টারসেকশন বা মোড় এবং ৩২টি ইউটার্ন রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম দফায় ৫৩টি স্থানকে স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যালের মাধ্যমে নজরদারির জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে।
চসিকের পরিকল্পনায় শুধু সংকেত বাতি বসানোই নয়; সড়কের নেটওয়ার্ক, মোড়ের ধরন, যানজটপ্রবণ এলাকা এবং নজরদারি ক্যামেরা বসানোর উপযুক্ত জায়গা নির্ধারণ করে সম্ভাব্য ব্যয়ের প্রাথমিক হিসাব তৈরি করা হয়েছে। স্মার্ট সিগন্যাল প্রকল্পের জন্য নগরীর গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে রাখা হয়েছে, জিইসি, ২ নম্বর গেট, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, ওয়াসা, লালখান বাজার, টাইগারপাস, স্টেশন রোড, কদমতলী, অক্সিজেন, এ কে খান, ফৌজদারহাট, সিটি গেট, আগ্রাবাদ, বাদামতলী, বারিক বিল্ডিং, নিউমার্কেট, কাস্টম হাউস, সিইপিজেড গেট, হালিশহর বাজার, কাপ্তাই রাস্তার মাথা, কালুরঘাট, চকবাজার, আন্দরকিল্লা, জামালখান, সিআরবি, ডিসি হিল এবং কাজীর দেউড়ি মোড়।
এর আগে চসিকের উদ্যোগে ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়নে ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৬ বছরে প্রায় ২কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। কিন্তু চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় না করে প্রকল্প করায়, ট্রাফিক বিভাগ সেই সিগন্যাল বাতিগুলো ব্যবহার করেনি। ফলে সমন্বয়হীনতার কারণে সেই প্রকল্পের পুরো টাকাই ভেস্তে যায়।
পরবর্তীতে ২০১৭ সালে সিডিএ কর্তৃপক্ষ নগরীর মুরাদপুর থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প অনুমোদনের পর, নির্মাণকাজের সুবিধার্থে নগরীর প্রধান সড়ক(এশিয়ান হাইওয়ে)-এর সব সিগন্যাল বাতি তুলে ফেলা হয়।
এরপর থেকে চট্টগ্রামের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আর কোথাও সিগন্যাল বাতি ব্যবহৃত হয়নি। তবে সংশ্লিষ্টদের আশা, নতুন সমন্বিত এআই প্রকল্পটির মাধ্যমে অতীতের সব খতিয়ান চুকিয়ে নগরবাসী একটি আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থা পাবে।