নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে আদমজী ইপিজেডের ইউনিভার্সেল মেনসওয়্যার লিমিটেডে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো শ্রমিকদের অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
রোববার (২৩ আগস্ট) সকালে কাজে যোগ দেওয়ার কিছুক্ষণ পর কয়েক দফায় নারী শ্রমিকসহ কয়েকজন অসুস্থ ও অজ্ঞান হয়ে পড়লে পরিস্থিতি বিবেচনায় কারখানাটিতে একদিনের জন্য সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
এর আগে শনিবারও একই কারখানার নতুন ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় কর্মরত শতাধিক নারী শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়ার কথা জানিয়েছিলেন শ্রমিকরা। ওই দিনও একের পর এক শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়ায় নির্ধারিত সময়ের আগেই কারখানা ছুটি দেওয়া হয়। দুই দিনের ঘটনায় শ্রমিকদের মধ্যে নানা ধরনের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লেও অসুস্থতার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি কারখানা কর্তৃপক্ষ।
রোববার সকাল ৬টার দিকে শ্রমিকরা কারখানায় কাজে যোগ দেন। সকাল ৭টার পর কয়েকজন নারী শ্রমিক হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাদের মধ্যে কয়েকজন অজ্ঞান হয়ে গেলে অন্য শ্রমিকদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে অসুস্থ শ্রমিকদের দ্রুত বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়।
কারখানা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, রোববার প্রায় ৯০ শতাংশ শ্রমিক কাজে উপস্থিত ছিলেন। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ১৫ থেকে ২০ জন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়ার পর নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়।
তবে শ্রমিকদের দাবি, অসুস্থ শ্রমিকের সংখ্যা এর চেয়ে বেশি। অসুস্থদের মধ্যে কয়েকজনকে আদমজী ইপিজেডের বেপজা মেডিকেল সেন্টার, স্থানীয় আলিফ হাসপাতাল ও সুগন্ধা হাসপাতালে নেওয়া হয়। কয়েকজনকে নারায়ণগঞ্জের খানপুরে ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শনিবার দুপুরের দিকে নতুন ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় কাজ করার সময় প্রথমে একজন নারী শ্রমিক অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করেন। পরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর পর্যায়ক্রমে আরও শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়লে কারখানা জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকদের দাবি, ওই দিন শতাধিক নারী শ্রমিক অসুস্থ হন। তাদের অনেকে বেপজা মেডিকেল সেন্টারে গিয়ে চিকিৎসা নেন।
শনিবারের ঘটনার পরও রোববার সকালে শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে হয়। কিন্তু কাজ শুরুর এক ঘণ্টার মধ্যেই আবার কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়ায় আগের দিনের আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। একপর্যায়ে কর্তৃপক্ষ কারখানা ছুটি ঘোষণা করে।
দুই দিনের ঘটনায় শ্রমিকদের মধ্যে অসুস্থতার কারণ নিয়ে নানা আলোচনা ও গুঞ্জন থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট কারণ সামনে আসেনি। গরম, কর্মপরিবেশ, বায়ু চলাচলসহ সম্ভাব্য বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
কারখানা কর্তৃপক্ষ ও বেপজা কর্মকর্তারা বলছেন, শ্রমিকদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অসুস্থতার প্রকৃত কারণ শনাক্ত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ইউনিভার্সেল মেনসওয়্যার লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার বিল্লাল হোসেন বলেন, সকালে প্রায় ৯০ শতাংশ শ্রমিক কাজে যোগ দিয়েছিলেন। এরপর অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ১৫ থেকে ২০ জন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়লে পরিস্থিতি বিবেচনায় কারখানা ছুটি দেওয়া হয়। শ্রমিকদের অসুস্থ হওয়ার প্রকৃত কারণ তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
শ্রমিকদের মধ্যে ভূত দেখার বিষয়ে যে গুঞ্জন ছড়িয়েছে- সে প্রসঙ্গে বিল্লাল হোসেন বলেন, কয়েকজন শ্রমিক এ ধরনের কথা বলছেন। তবে কারখানা কর্তৃপক্ষ এ ধরনের বিষয়কে বিশ্বাস করছে না। কারখানার বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকরা অসুস্থ হয়েছেন এবং কী কারণে এমনটি হচ্ছে- তা খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
এদিকে নারায়ণগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-৪-এর ওসি (ইন্টেলিজেন্স) মো. আনোয়ারুল হক বলেন, প্রচণ্ড গরমের কারণে কয়েকজন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়ায় পরিস্থিতি বিবেচনায় কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। অসুস্থ ২০ জন শ্রমিককে খানপুর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
আদমজী ইপিজেডের বেপজার অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক নাসরিন জানান, রোববারও কয়েকজন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে তারা কারখানাটি সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শনের সময় কারখানায় দম বন্ধ হয়ে যাওয়া, শ্বাসরোধ বা এ ধরনের কোনো প্রত্যক্ষ সমস্যার বিষয় তাদের নজরে আসেনি।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের মধ্যে ভূত দেখার কথা শোনা গেলেও সেটিকে অসুস্থতার কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রকৃত কারণ কী- তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শ্রমিকদের নিরাপত্তার স্বার্থে রোববার কারখানাটি বন্ধ রাখা হয়েছে।