খালের ওপর কোটি টাকায় নির্মাণ হয়েছে সেতু। কিন্তু নেই সংযোগ সড়ক। পথচারীদের সেতুতে উঠতে হচ্ছে বাঁশ ও কাঠের তৈরি সাঁকো বেয়ে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের বড়াইকান্দি গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষ।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাড়াইকান্দি গ্রামের খালের ওপর নির্মিত সেতুটির দুই প্রান্তে সংযোগ সড়ক না থাকায় কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। সেতুর দুই পাশে গভীর গর্ত ও অসমতল অংশ থাকায় স্থানীয়রা নিজেদের উদ্যোগে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে একটি অস্থায়ী সাঁকো নির্মাণ করেছেন। সময়ের সঙ্গে সেটিও নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। ফলে মোটরসাইকেল, অটোরিকশা কিংবা অন্য কোনো ছোট-বড় যানবাহন তো দূরের কথা, পায়ে হেঁটেও পারাপার হওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন এলাকার বয়স্ক ও শিক্ষার্থীরা। প্রতিদিন স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কৃষক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই পথ ব্যবহার করছেন। বর্ষা মৌসুমে বাঁশের সাঁকো পিচ্ছিল হয়ে পড়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরও বেড়ে গেছে। যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের বড়াইকান্দি খালের ওপর সেতু নির্মাণ করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ অধিদপ্তর। ৫০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৪ ফুট প্রস্থের সেতুটির ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১ কোটি ৫ লাখ টাকা। নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স রামিম এন্টারপ্রাইজ।
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে কাজ শুরু হয়। জুনের মধ্যে সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। চুক্তি অনুযায়ী সেতুর উভয় পাশে সংযোগ সড়ক নির্মাণ করার কথা। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সংযোগ সড়ক নির্মাণ না করেই পুরো বিল তুলে নিয়েছে। প্রায় তিন মাস আগে কাজ শেষ হলেও এখন পর্যন্ত সেতুর দুই পাশে সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের নকশা ও চুক্তি অনুযায়ী সেতুর উভয় পাশে সংযোগ সড়ক নির্মাণের কথা থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সেই কাজ সম্পন্ন না করেই বিল উত্তোলন করেছে। প্রায় তিন মাস আগে সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হলেও এখন পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিষয়টি পিআইওকে একাধিকবার জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রায় ২০ হাজার মানুষের একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম সেতুটি ব্যবহার অনুপযোগী থাকায় ক্ষোভ এলাকাবাসীর।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে সেতুটি চলাচলের উপযোগী করা হোক। পাশাপাশি, চুক্তি অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন না করেই কীভাবে বিল পরিশোধ করা হলো, তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
স্থানীয় কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এ পথ দিয়ে বাজারে যেতে হয়। কৃষিপণ্য কখনো ঘাড়ে, কখনো মাথায় করে সেতু পারাপার হতে হয়। সংযোগ সড়ক থাকলে ভ্যান বা সাইকেলে করে নেওয়া সহজ হতো।
কলেজ শিক্ষার্থী আরিফুর রহমান বলেন, বর্ষা এলেই ভয় আরও বেড়ে যায়। সাঁকো পিচ্ছিল হয়ে পড়ে। যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সেতু নির্মাণ করা হলেও কোনো উপকারই আমরা পাচ্ছি না। তিনি দ্রুত সংযোগ সড়ক নির্মাণের দাবি জানান।
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, কোটি টাকার সেতু হয়েছে, কিন্তু সেতুতে ওঠার রাস্তা নেই। বাধ্য হয়ে বাঁশের সাঁকো দিয়ে পারাপার হতে হচ্ছে। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যায়। দুশ্চিন্তা হয়, কখন পানিতে পড়ে যায়।
এ বিষয়ে জানতে মেসার্স রামিম এন্টারপ্রাইজের ঠিকাদার জিয়াউর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
এদিকে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মশিউর রহমানকে অফিসে গিয়েও দেখা পাওয়া যায়নি। এমনকি তাঁর ব্যবহৃত সরকারি নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, খালে পানি থাকায় সেতুর দুই পাশে সংযোগ সড়ক নির্মাণে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। ঠিকাদারকে দ্রুত বাকি কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর যতটুকু কাজ সম্পন্ন হয়েছে, ততটুকুর বিপরীতেই বিল পরিশোধ করা হয়েছে। আশা করছি দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে।