গত রাত থেকে রোববার বিকেল পর্যন্ত মুষলধারে বৃষ্টি কার্যত অচল করে দিয়েছে রাজধানী ঢাকাকে। এমন বৃষ্টির প্রভাবে বলতে গেলে দিনভর পানির নিচে ছিল রাজধানী ঢাকা। ২৪ ঘন্টার টানা ভারি বষর্ণে জলাবদ্ধতায় স্থবির হয়ে পড়েছিল রাজধানী ঢাকা। ঢাকার অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক-সবখানেই পানি।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে আজ সর্বশেষ ৬ ঘণ্টায় ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি মাসে সর্বোচ্চ। এই পরিস্থিতিতে আজ সারা দিন রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ভারী বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নিম্নচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে সৃষ্ট এই টানা বর্ষণে বিরতিহীনভাবে আকাশে মেঘের গর্জনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঝরেছে বৃষ্টি, আর তাতেই সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে রাজধানী কার্যত ডুবে গেছে পানির নিচে। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী ও জরুরি কাজে বের হওয়া সাধারণ মানুষকে পড়তে হয়েছে চরম দুর্ভোগে।
বাদ যায়নি রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী ও বারিধারাও। বিরতিহীন এই বৃষ্টিতে মোহাম্মদপুরের একাংশ, মেরুল বাড্ডা, ডিআইটি প্রজেক্ট এলাকা, ইসিবি, মালিবাগ, শান্তিনগর, সায়েদাবাদ, আগারগাঁও থেকে জাহাঙ্গীর গেটমুখী নতুন সড়ক, খামারবাড়ি থেকে ফার্মগেট, ফার্মগেট-তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকা, শনির আখড়া, পুরান ঢাকার বংশাল ও নাজিমউদ্দিন রোড, ধানমন্ডি, মিরপুর ১৩, কালশী, হাতিরঝিলের একাংশ, গুলশান লেকপাড়, কালাচাঁদপুর এবং বারিধারার সংযোগ সড়কসহ রাজধানীর অসংখ্য সড়ক ও অলিগলিতে দেখা দিয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা।

জলাবদ্ধতার পানিতে অনেক বাস, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেল বিকল হয়ে পড়েছে রাস্তায়। কয়েকটি এলাকায় সিএনজি ও গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চালকদের ঠেলে নিয়ে যেতে দেখা গেছে। রিকশা ও ভ্যানচালকরা বাড়তি ভাড়া হাঁকলেও পানি বেশি থাকায় অনেক রাস্তায় তারাও চলাচল করতে পারেননি। দোকানপাটে পানি ঢুকে মালামাল নষ্টের শঙ্কায় ব্যবসায়ীরা তড়িঘড়ি করে জিনিসপত্র উঁচু জায়গায় সরিয়ে রেখেছেন।
বিজয় সরণি ও তেজগাঁও হয়ে হাতিরঝিলের দিকে আসা সিএনজিচালক জাহিদুর রহমান বলেন, আসার পথে একাধিক সড়ক ও অলিগলি পুরোপুরি পানিতে তলিয়ে থাকতে দেখেছি। জমে থাকা পানিতে দু-একটি সিএনজির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চালকদের ঠেলে নিয়ে যেতেও দেখেছি। বলতে গেলে পুরো ঢাকা শহরের সব সড়কেই জলাবদ্ধতা ছিল।
মিরপুর এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী আরিফুল ইসলাম বলেন, সকালে অফিসে বের হয়ে মনে হয়েছে রাস্তা নয়, যেন খাল পার হচ্ছেন। কোথায় ম্যানহোল আছে, কোথায় গর্ত আছে কিছুই বোঝার উপায় ছিল না। কাপড়, জুতা সব ভিজে গেছে। প্রতিবার বর্ষায় একই কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছে। এত উন্নয়নের কথা শোনা যায়, কিন্তু বৃষ্টি হলেই সবকিছু পানির নিচে চলে যায় ঢাকায়।
টানা বর্ষণে সড়কে জমে থাকা পানির উচ্চতা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। অনেক অলিগলি, বাসাবাড়ির প্রবেশপথ, দোকানপাটের সামনের অংশ এবং নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও নর্দমার পানি উপচে সড়কে মিশে যাওয়ায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেন, টানা ভারী বর্ষণে সাময়িক জলজট তৈরি হলেও আমাদের কর্মীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভোর থেকে মাঠে রয়েছে। জলাবদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকতা দূর করে নগরজীবন স্বাভাবিক রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।
এদিকে জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নের জন্য মাঠে নেমেছেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান। তিনি ইতোমধ্যে ভারী বৃষ্টির ফলে গুলশান, বনানী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচে, জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের রাস্তায় সৃষ্ট জলজট পরিস্থিতি সরেজমিন পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা প্রদান করেছেন।

গত ১৬ বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় এবং ওয়াসা থেকে দুই সিটি কর্পোরেশনের কাছে নালা ও খাল হস্তান্তর করেও কাটেনি ঢাকার জলাবদ্ধতা সংকট। বর্ষা শুরুর আগেই সামান্য বৃষ্টিতে নাকাল হচ্ছে নগরবাসী। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা জানালেও, একদিকে অকেজো পাম্প স্টেশন ও স্লুইসগেট, অন্যদিকে অবৈধ দখল ও প্লাস্টিক বর্জ্যে ভরাট হওয়া খালের কারণে এবারের আষাঢ়-শ্রাবণেও রাজধানীতে তীব্র জলজটের আশঙ্কা করছিলেন সংশ্লিষ্টরা।
নগর পরিকল্পনাবিদরা জানিয়েছেন, মূলত পাঁচ স্তরের সংকট একসঙ্গে জেঁকে বসেছে ঢাকার বুকে। প্রথমত, সড়কের ক্যাচপিটের ছিদ্রগুলো আবর্জনায় বন্ধ; দ্বিতীয়ত, ড্রেনগুলো পলি ও কাদায় ভরা; তৃতীয়ত, অবৈধ দখলে হারিয়ে গেছে প্রধান খালগুলো; চতুর্থত, পাম্পিং স্টেশনগুলো অকেজো; পঞ্চমত, চারপাশের নদনদীগুলো ভরাট হয়ে হারিয়েছে পানি ধারণের সক্ষমতা।
ফলে বৃষ্টির পানি ক্যাচপিট থেকে ড্রেনে, ড্রেন থেকে খালে এবং খাল হয়ে নদীতে যাওয়ার প্রতিটি ধাপেই অচল হয়ে পড়ে। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা ব্যয়, দফায় দফায় সভা আর প্রতিশ্রুতির বন্যা বয়ে গেলেও সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান হয় না। সমস্যার গভীরে হাত না দিয়ে বারবার উপরিভাগে প্রলেপ দেওয়ার কারণেই প্রতি বর্ষায় ঢাকা ফিরে সেই চেনা ও চরম ভোগান্তির রূপে।
সূত্র: ঢাকা পোস্ট