মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি ও এজেন্ডাকে স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান করে ভোটের রায়। মার্কিন ভোটাররা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের নীতি ও শাসনের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে এ রায় দিয়েছেন। মূলত মুদ্রাস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক নানা সংকটে ক্ষুব্ধ মার্কিন ভোটাররা বর্তমান প্রশাসনকে এ নির্বাচনের মাধ্যমে এক চরম বার্তা দিয়েছেন। যার ফলে এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এক বিশাল ঐতিহাসিক ‘ব্লু ওয়েভ’ বা নীল ঝড়ের সাক্ষী হলো বিশ্ব।
দীর্ঘ ও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াই শেষে ডেমোক্র্যাটরা দুই কক্ষেই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। গতকাল রাত ২টায় শেষ খবর পর্যন্ত নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে ডেমোক্র্যাটরা প্রায় ২৪০টি আসন পেয়ে বড় ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেছে, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ছিল ২১৮টি আসন। অপরদিকে রিপাবলিকান পার্টি পেয়েছে ১৩৯টি আসন।
উচ্চকক্ষ সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা ৫৪টি আসন নিশ্চিত করেছে। যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ৫১টি পেলেই হয়। রিপাবলিকরা নিশ্চিত করেছে ৪৪টি। গত পরশুর মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছরের শাসনকাল ও তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে।
নির্বাচনের এই বড় বিপর্যয়ের পর ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র। ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক পোস্টে দাবি করেন, তিনি ব্যালটে থাকলে রিপাবলিকানরা বিপুল ব্যবধানে জিতত। তবে পরবর্তীতে ফক্স নিউজ ও নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে বলেন, ‘ডেমোক্র্যাটরা ভালো কাজ করেছে’ এবং তিনি দেশের স্বার্থে তাদের সঙ্গে মিলে কাজ করতে প্রস্তুত। অবশ্য হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে, ট্রাম্প সহজে দমে যাওয়ার পাত্র নন। ডেমোক্র্যাটদের আনা যেকোনো বিলে বাধা দিতে তিনি তাঁর বিশেষ রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বা ‘ভেটো’ প্রয়োগ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
মার্কিন রাজনীতিতে আগামী দিনের প্রভাব কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির এই নিয়ন্ত্রণ হোয়াইট হাউসের জন্য এক নতুন সংকটের জন্ম দিল। আগামী দুই বছর ট্রাম্প প্রশাসন চাইলেই একক সিদ্ধান্তে কোনো বাজেট বা আইন পাস করতে পারবে না।
সবচেয়ে বড় বিষয়, ডেমোক্র্যাটদের নেতৃত্বাধীন সংসদীয় কমিটিগুলো এখন ট্রাম্পের কর ফাঁকি, ইরান যুদ্ধ পরিচালনা, গণ-ডিপোর্টেশন এবং প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির নানা অভিযোগের তদন্ত শুরু করার পূর্ণ ক্ষমতা পেল, যা ট্রাম্পের অবশিষ্ট মেয়াদে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে রাখবে।
ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্পের শীর্ষস্থানীয় আইনগত অগ্রাধিকার ও নীতিগুলো (যেমন ‘সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট’) পাস করানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে এবং তিনি অনেকটা ‘লেইম-ডাক’ (কার্যক্ষমতাহীন) প্রেসিডেন্ট হয়ে পড়বেন।
কংগ্রেসের ক্ষমতা ব্যবহার করে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসন এবং তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে তদন্ত, সমন জারি এবং এমনকি অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করার সুযোগ পাবে। বিচারপতি ও কর্মকর্তা নিয়োগে বাধা : ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্পের পরবর্তী সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বা অন্যান্য প্রশাসনিক নিয়োগ আটকে দিতে পারবে। প্রেসিডেন্ট পদ হারাবেন না : মধ্যবর্তী নির্বাচনে হেরে গেলে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট পদ হারাবেন না এবং নির্বাহী আদেশ জারির মাধ্যমে তিনি নিজের একক কিছু ক্ষমতা প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে পারবেন।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার ফলে ডেমোক্র্যাটরা বিভিন্ন সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন ও তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন নীতি, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে তদন্ত, সমন জারি এবং প্রয়োজনে অভিশংসন প্রক্রিয়া জোরালো করার সুযোগ পাবে।
ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের অন্তত ৭টি গুরুত্বপূর্ণ আসন নিজেদের দখলে নিয়েছে। টেক্সাস, ওহাইও, ক্যানসাস, আইওয়া, নর্থ ক্যারোলিনা, সাউথ ক্যারোলিনা এবং মেইনের মতো ঐতিহ্যবাহী কট্টর রিপাবলিকান ঘাঁটিতেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। এর মধ্যে ক্যানসাসে প্রায় ১০০ বছরের মধ্যে এই প্রথম কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জয়লাভ করলেন।
শুধু আইনসভাই নয়, টেক্সাস, জর্জিয়া, ওহাইও, নেভাদা এবং আইওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোতে গভর্নর পদেও রিপাবলিকানদের হটিয়ে জয়ী হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা।
মিশিগান অঙ্গরাজ্য থেকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাঈদ বিজয়ী হয়ে মার্কিন ইতিহাসের প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন।
জর্জিয়ার গভর্নর নির্বাচনে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কিশা ল্যান্স বটমস। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হিসেবে রেকর্ড গড়লেন।